Writing

বাপ-দাদার অনুসরণ

বাপ-দাদার অনুসরণ নামে একটি প্রথা প্রসিদ্ধ আছে। কুরআন-সিরাত-ইতিহাসের বিভিন্ন অধ্যায়ে আমরা এর আলোচনা পাই। নবি আলাইহিমুস সালাম যখন একত্ববাদের দাওয়াত নিয়ে তাদের উম্মতের কাছে যেতেন, তারা তাদের বাপ-দাদার পথ অনুসরণ করার কথা বলে হিদায়াত গ্রহণ থেকে বিরত থাকত। প্রত্যাখ্যান করত নবির সত্য ধর্মকে।

হজরত নুহ, ইবরাহিম, মুসা, ঈসা আলাইহিমুস সালাম এবং নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকেও এই কথা শুনতে হয়েছে। মক্কার কাফিরদের দাওয়াত দিয়েছেন, তারা বলেছে, আমরা আমাদের বাপ-দাদার ধর্ম ছাড়তে পারব না। তুমি কে—আমাদের বাপ-দাদা নিয়ে প্রশ্ন তুলছ?

এমন অনেক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমের অনেক জায়গায় বাপ-দাদার অনুসরণ সম্পর্কে বলেছেন। যেমন বলেছেন—

وَإِذَا قِيلَ لَهُمْ تَعَالَوْا إِلَى مَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَإِلَى الرَّسُولِ قَالُوا حَسْبُنَا مَا وَجَدْنَا عَلَيْهِ آبَاءَنَا
অর্থ : আর যখন বলা হয়, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তার দিকে এবং রাসুলের দিকে আসো। তারা বলে, আমরা আমাদের বাপ-দাদাকে যার ওপর পেয়েছি—তাই আমাদের জন্য যথেষ্ট।
[সুরা মায়িদা, আয়াত : ১০৪]

অন্যত্র বলা হয়েছে—

إِنَّ اللَّهَ لَعَنَ الْكَافِرِينَ وَأَعَدَّ لَهُمْ سَعِيرًا . خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا لَا يَجِدُونَ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا . يَوْمَ تُقَلَّبُ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ يَقُولُونَ يَا لَيْتَنَا أَطَعْنَا اللَّهَ وَأَطَعْنَا الرَّسُولَا . وَقَالُوا رَبَّنَا إِنَّا أَطَعْنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَاءَنَا فَأَضَلُّونَا السَّبِيلَا . رَبَّنَا آتِهِمْ ضِعْفَيْنِ مِنَ الْعَذَابِ وَالْعَنْهُمْ لَعْنًا كَبِيرًا
অর্থ : নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা কাফিরদের লানত করেছেন এবং তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জাহান্নাম। তাতে তারা সর্বদা থাকবে। কোনো বন্ধু ও কোনো সাহায্যকারী পাবে না। যেদিন তাদের উপুড় করে জাহান্নামে ফেলে দেওয়া হবে, তারা বলবে, কতই-না ভালো হত, যদি আমরা আল্লাহর কথা মানতাম এবং রাসুলের কথা মানতাম। আরও বলবে, হে আল্লাহ, আমরা আমাদের নেতা ও বড়দের কথা মেনেছি, তারা আমাদের পথভ্রষ্ট করেছে। হে আল্লাহ, তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করুন এবং তাদের বড় লানত দিন।
[সুরা আহজাব, আয়াত : ৬৪-৬৮]

এ-সকল আয়াত দ্বারা আমাদের সামনে প্রতীয়মান হয়, বাপ-দাদার অনুসরণ করা যাবে না। কিন্তু আসলেই কি এখানে আল্লাহ তাআলা এই উদ্দেশ্য নিয়েছেন? বাপ-দাদার অনুসরণ করতে নিষেধ করে দিয়েছেন? পূর্ববর্তীদের অনুসরণ জাহান্নামের কারণ সাব্যস্ত করেছেন?

প্রথম আলোচিত আয়াতটির দ্বিতীয় অংশে আল্লাহ তাআলা বলেছেন—

أَوَلَوْ كَانَ الشَّيْطَانُ يَدْعُوهُمْ إِلَى عَذَابِ السَّعِيرِ
অর্থ : শয়তান যদি তাদের দোজখের আজাবের দিকে ডাকে তাহলেও।
[সুরা লুকমান, আয়াত : ২১]

আল্লাহ তাআলা পূর্বপূরীকে খারাপ বলেছেন যখন তারা জাহান্নামের পথে থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর পথ ধরে না, তাদের বাপ-দাদার জাহান্নামি পথই অনুসরণ করে।

আল্লাহর নবি হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের কথা কুরআনুল কারিমে এসেছে। আল্লাহর এই নবি বড়ই গর্বের সাথে বলেছেন, وَاتَّبَعْتُ مِلَّةَ آبَائِي আমি আমার বাপ-দাদার ধর্মের অনুসরণ করেছি।

সৎ বাপ-দাদার অনুসরণের ওপর গর্ব করা তো নবি আলাইহিমুস সালামের সুন্নাত। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاتَّبَعَتْهُمْ ذُرِّيَّتُهُمْ بِإِيمَانٍ أَلْحَقْنَا بِهِمْ ذُرِّيَّتَهُمْ وَمَا أَلَتْنَاهُمْ مِنْ عَمَلِهِمْ مِنْ شَيْءٍ كُلُّ امْرِئٍ بِمَا كَسَبَ رَهِينٌ
অর্থ : যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের পথে চলেছে তাদের সন্তান-সন্তুতি ঈমানের সাথে, আমি তাদের কাছে তাদের সন্তান-সন্তুতিকে পৌঁছে দিয়েছি। আমি তাদের থেকে তাদের আমলকে সামান্য কমাইনি। প্রত্যেক মানুষ নিজ কামাইয়ের মাঝে বন্দি।
[সুরা জারিয়াত, আয়াত : ৫১]

পূর্বসূরীদের অনুসরণের কথা এখানেই শেষ নয়। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَالسَّابِقُونَ الْأَوَّلُونَ مِنَ الْمُهَاجِرِينَ وَالْأَنْصَارِ وَالَّذِينَ اتَّبَعُوهُمْ بِإِحْسَانٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ وَأَعَدَّ لَهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي تَحْتَهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ذَلِكَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ
অর্থ : আর যারা অগ্রবর্তী, সবার আগে হিজরতকারী এবং সাহায্যকারী এবং যারা সততার সাথে তাদের অনুসরণ করবে, আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি। তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন এমন জান্নাত যার তলদেশ দিয়ে নদী প্রবাহিত হয়। তাতে তারা সর্বদাই থাকবে। এটাই বড় সফলতা। [সুরা তাওবা, আয়াত : ১০০]

অন্য এক আয়াতের ভাষ্যে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন—

وَاتَّبِعْ سَبِيلَ مَنْ أَنَابَ إِلَيّ
আর তাকলিদ করো তার মাজহাবের যে আমার দিকে অবনত হয়।
[সুরা লুকমান, আয়াত : ১৫]

নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের জীবনে বাপ-দাদার অনুসরণ শব্দের কারণে যতটা নিপীড়িত হয়েছেন—দ্বিতীয়জন পাওয়া যাবে না। বর্ণিত হয়েছে—
أَبَا هُرَيْرَةَ، يَقُولُ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَكُونُ فِي آخِرِ الزَّمَانِ دَجَّالُونَ كَذَّابُونَ، يَأْتُونَكُمْ مِنَ الْأَحَادِيثِ بِمَا لَمْ تَسْمَعُوا أَنْتُمْ، وَلَا آبَاؤُكُمْ، فَإِيَّاكُمْ وَإِيَّاهُمْ، لَا يُضِلُّونَكُمْ، وَلَا يَفْتِنُونَكُمْ
হজরত আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আমার উম্মত শেষ জামানায় এমন মিথ্যুক ও দাজ্জাল প্রকৃতির ব্যক্তি হবে, যারা তোমাদের কাছে কিছু হাদিস নিয়ে আসবে, হাদিসগুলো এমন হবে, যা তোমাদের বাপ-দাদারা কখনো শুনেনি (তথা বাপ-দাদার আমলি তাওয়াতুরের বিপরীত হবে)। ওই সকল দাজ্জাল ও মিথ্যুকদের থেকে বেঁচে থেকো। তাদেরকে তোমাদের কাছে ভিড়তে দিয়ো না। এমন যেন না হয়, তারা তোমাদের মাঝে বিভ্রান্তি ও ফিতনা ছড়িয়ে দেয়।
[সহিহ মুসলিম, হাদিস : 07]

হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর এ বিষয়ে কওলটি মনে পড়ছে না। তবে পূর্বসূরীদের অনুসরণ না করার ভয়াবহ পরিণামের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন।

আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারিমে যেসব পূর্বসূরীদের অনুসরণ করতে মানা করেছেন, তারা ছিল কাফির পূর্বসূরী। তাদের অনুসরণ ছিল কুফরির দিকে। অথচ আমাদের পূর্বসূরীরা ছিলেন মুসলিম এবং আমাদের জন্য উজ্জ্বল প্রদীপের মতো। ছিলেন ইলম এবং আমলের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপক। তাহলে আমরা কেন তাদের অনুসরণ করব না?

যদি তারা কোনো ভুল করে থাকে তা কিন্তু দুই প্রকার। ইজতিহাদি ভুল হলে তারা অবশ্যই সাওয়াবের ভাগীদার হবেন; সুতরাং এ বিষয়ে তাদের নিন্দা করা গ্রহণযোগ্য নয়। তবে তার সেই ইজতিহাদ অনুসরণীয় নয়। আর যদি ইচ্ছাকৃত গুনাহ করে থাকেন, তবে তা অবশ্যই বর্জনীয়, নিন্দনীয়, অগ্রহণযোগ্য। তবে এটা কোনোভাবেই পূর্বসূরীদের অনুসরণ বাতিলের পক্ষে দলিল নয়।

কুরআনুল কারিমের এই আয়াতটি কোন বিষয়ে?
كَبِيرُهُمْ هَذَا فَاسْأَلُوهُمْ إِنْ كَانُوا يَنْطِقُونَ
সাধারণ কোনো তাফসির পাঠক বলে দেবে এখানে বোঝানো হয়েছে বড় মূর্তির কথা। যা কাফিরদের পূজনীয় ছিল। তিনি এখানে কাফিরদের বড়দের অসাড়তা প্রমাণ করেছেন। সেও বড় ছিল, কিন্তু কাফিরদের কাছে। এটা কাফিরদের জন্য। কিন্তু কিছু মানুষের অজ্ঞতা এটাকে সকল বড়কে প্রত্যাখ্যাত বলে প্রমাণ করে। অথচ কাফিরদের বাপ-দাদা যেমন অনুসরণীয় না, মুসলিম বাপ-দাদার অনুসরণ তেমন গৌরবের বিষয়। কুফফার আকাবির যেমন অনুসরণীয় না—মুসলিম আকাবির তেমন গৌরবের বিষয়। এটাই সালাফদের ভাবনা, সাহাবায়ে কিরামের ভাবনা, নবি এবং আল্লাহ তাআলার ভাষ্য।

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Islami Lecture