Writing

প্রকৃত বন্ধু পর্ব- ০৮

আছরের নামায পড়ে মসজিদের পাশের চায়ের দোকানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। দেখি সংসদ ভবনে মানুষের ভিড়। জানেনই তো— আমাদের মতো গরিবদের জন্য সংসদ হলো চায়ের দোকান। আমরা তো আর রাষ্ট্রের সংসদ ভবনে গিয়ে মত প্রকাশ করতে পারবোনা। তাই এই সংসদে বসে যে যার মত প্রকাশ করে। তো চলছে সংসদে রসালো কসালো গল্প।

এবার আপনারা ভাবতেছেন আমি কসালো কেন বললাম। কষালো শব্দতো আশাকরি অভিধানের পেছনের পৃষ্ঠাতেও নেই। আসলে আমি কষালো বললাম এই কারণে, এই সংসদে যাকে বিষয় বানানো হয়, তাঁর পুরো শরীরকে ধুয়ে ফেলা হয়। কাউকে কষিয়ে চড় মারার মতো।
মানে, তাঁর যত খারাপ দিক আছে সেগুলোকে এমনভাবে পরিবেশন করা হয় যেন মনে হয়, সে সারা জীবনে কোন ভাল কাজ করেনি। যেটা কষিয়ে চড় মারার চেয়ে জঘন্য। যার নিমিত্তে মানুষের মাঝে তাঁর প্রতি খারাপ ধারণা জন্মায়।
যেটিকে শরিয়তের ভাষায় গীবত বলা হয়। গীবতকারী সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা এরশাদ ফরমান —

তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তারা মৃত ভ্রাতার মাংস ভক্ষণ করা পছন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।
সূরা হুজুরাত – ১২

দোকানদারকে চায়ের অর্ডার দিলাম। চা দিলো। চা খেতে খেতে গল্পের মাঝে কেরোসিন ঢেলে গল্পকে আরো ইন্টারেস্ট করে তোলছি। মানে না বুঝলে কিছু করার নেই।
দোকানের সামনের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলো আদিব। আমি খেয়াল না করলেও আদিব ঠিকই খেয়াল করলো আমাকে। চুপিচুপি এসে আমার কাঁধে হাত রাখলো। আমি পিছনে ফিরে বললাম, কে-রে?
তোর জম।
হুম। বস, একটু চা খা।
আমি খাবোনা। তুই খা। চল, হাঁটতে যাবো।

কোথায়?
দেখি, কোথায় যাইতে পারি।
ঠিক আছে, চল।
হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির পাশের আম বাগানে চলে আসলাম। বাগানে বাঁশের তৈরি বানানো একটি বৈঠকখানা আছে।যখন প্রখর গরম পরে পাড়ার সবাই সেখানে চলে আসে। কারণ, সেখানে প্রচুর বাতাস থাকে। যতই গরম পরুক না কেন সেখানে থাকে শীতল। আমরা এসে বসলাম। এবার আদিব বলল,

তুই চায়ের দোকানে কী করছিলি?
কিছু না। গল্প করছিলাম।
কী গল্প করছিলি শুনি?
তেমন কিছু না। যখন যেটা উঠে।

হুম। আশাকরি গীবত ছাড়া ভালো কিছু হবেনা। কারণ, চায়ের দোকানে মানুষের দোষ নিয়েই কথা হয়। যার নিমিত্তে ব্যাক্তিটির প্রতি মানুষের খারাপ ধারণা জন্মায়। কেউ কেউ তো বলেই দেয়— আমি ব্যাক্তিটিকে অনেক ভালো মনে করেছিলাম। এখন দেখি সে জঘন্য। অথবা বলে— আমি তো তাঁর সাথে ব্যাবসা করতে প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এখন দেখি লোকটি ভালো না।

তাইতো বলি, যদি আমি নগন্যের কৃতকর্মের গুণকীর্তন শুনতে চাও, তাহলে আমার মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করো।(লেখকের কথা)
হুম। এইরকমই কিছু চলছিলো আর কী।

একটা কথা সবসময় মনে রাখবি— জনসমাগম, লোকের ভিড়, দোকানের আড্ডাখানা এগুলো থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করবি। কারণ, সেখানে এমন কিছু কথা থাকে, যেগুলো আজ না হয় কাল নতুবা কয়েকবছর পরে হলেও তুর জন্য কাল হয়ে দাঁড়াবে।
বুঝলাম না ঠিক।

বুঝিয়ে বলছি। ধর,আড্ডার মধ্যে আমি তোর নামে একটা বাজে কথা বললাম। তখন ওখানে থাকা আরেক লোক তোকে বলে দিল যে, আমি তোর নামে এরকম-ওরকম বলছি। তুই তো শুনে রেগে আগুন। আমার নামে এমন কথা বলার সাহস কী করে হলো ওর! এবার তুই কথিত লোকটিকে ধরাশায়ী করার জন্য সাক্ষী খুঁজতে শুরু করলি। এখন তুই সাক্ষী হিশেবে বিবেচিত করলি এমন এক ব্যাক্তিকে যে কী-না আমার আর তো খুব ঘনিষ্ঠ, আপন।

এখন সাক্ষীটি দ্বিধায় পড়ে গেল। তোর পক্ষে বললে আমার বিরুদ্ধে হয়ে যাচ্ছে। আমার পক্ষে বলতে গেলে তোর বিপক্ষে হয়ে যাচ্ছে।
মোদ্দাকথা দুই রুমের মাঝের দরজায় দাড়িয়ে থাকার মতো। এক রুমে আছে মা, অন্য রুমে আছে বাবা। মায়ের রুমে গেলে বাবার রুমে যেতে পারবেনা। বাবার রুমে গেলে মায়ের রুমে আসতে পারবেনা। লোকটি এখন মহা ঝামেলায় পড়ে গেল। অথচ লোকটির মা-বাবা দুজনকেই দরকার। এবার লোকটি নিজেকে নিজে বকা দিতে শুরু করলো। কেন আমি সেখানে গেলাম?
আচ্ছা এই লোকটি যদি তুই হস, তাহলে তুই কী করবি?
নিশ্চয় তুই-ও লোকটির মতো নিজেকে নিজে বকবি।

তাই যত সম্ভব ভিড় এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। এখন তুই আমার কথাগুলোকে উপদেশ মনে কর নতুবা বকওয়াস, এটি তোর ব্যাপার।
তোর কথাকে কী আমি কখনো বকওয়াস মনে করতে পারি?
অবশ্যই তুই আমার ভালোর জন্যই বললি।
বলতে বলতে মাগরিবের সময় হয়ে এলো। মুয়াজ্জিনে মধুর সূরে আযান ফুকারে।

হুম। এবার চল, আযান হচ্ছে।(আদিব)
তুই যা। আমাকে একটু ঘরে যেতে হবে। তারপর মসজিদে যাবো।
ঠিক আছে।

আদিব চলে যেতে লাগলো। আমি আদিবের চলে যাওয়া দেখতে লাগলাম। সত্যিই আমি একজন বন্ধু পেয়ে নিজেকে ধন্য মনে করি। যদি কখনো ভুল পথে পা বাড়ায় সে সঠিক পথে টেনে নিয়ে আসে। যখন ভুল কোন কাজ করি, সে যুক্তি দিয়ে, হাদিস দিয়ে আমাকে বুঝিয়ে দেয়।

এমন একজন বন্ধু এই মুসাফির সফরের জন্য খুব প্রয়োজন।

প্রকৃত বন্ধু সিরিজ
প্রকৃত বন্ধু পর্ব- ০৮

লিখেছেন

Show More

Related Articles

Leave a Reply, if you have comments about this post.

Back to top button