Writing

নেতা নির্বাচনে পাঁচ ভুল

নেতা নির্বাচনে পাঁচ ভুল

নেতা নির্বাচনে পাঁচ ভুল। নেতৃত্ব সম্পর্কে আমাদের বেশ কিছু ভুল ধারণা আছে। নেতা নির্বাচনে আমরা এমন কিছু শর্ত জুড়ে দিই, যেগুলোর সাথে আসলে নেতা হবার যোগ্যতার কোনো সম্পর্ক নেই। আজ সেগুলো নিয়ে আলোচনা করবো।

নেতৃত্বের সাথে জ্ঞানের সম্পর্ক নেই

১। নেতৃত্বের সাথে জ্ঞানের সম্পর্ক নেই
একজন ভাই সাতটি ভিন্ন কিরআতে কুরআন তেলাওয়াত করতে পারেন। এটা বেশ ভালো গুণ। তাই বলে এই গুণের আলোকে তাকে নেতা বানাবেন না। নেতা হতে হলে তাকে সাতটি কিরআতে কুরআন তেলাওয়াত করতে হবে না। কেউ কুরআন-হাদীসের উপর পিএচডি করতে পারেন, তাই বলে তাকে নেতা বানাবেন না। তার কাছে গিয়ে পারলে ইলম অর্জন করুন, কিন্তু শুধুমাত্র তার জ্ঞানের ফলে তাকে নেতৃত্বের আসনে বসাবেন না।

জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষদেরকে নিয়োগ দিন। যেমন: মসজিদে ইমামতি করানোর জন্য কুরআন সম্পর্কে সবচেয়ে বিজ্ঞ ব্যক্তিকে, ডাক্তার-শিক্ষকদের এসোসিয়েশনে জ্ঞানী ডাক্তার-শিক্ষকদের নিযুক্ত করুন।
সেটা ভিন্ন কথা।
কিন্তু, কাউকে নেতা বানানোর আগে তার কয়টা ডিগ্রি আছে, কতোটি সার্টিফিকেট আছে সেগুলো না দেখে সবার আগে দেখুন নেতৃত্ব দেবার মতো সক্ষমতা তার আছে কিনা। নেতৃত্ব দেবার সক্ষমতার পাশাপাশি যদি সে জ্ঞানী হয়, তাহলে তো বেশ ভালো।

এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই যে, আবু যর আল-গিফারী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) খালিদ ইবনে ওয়ালিদ ও আমর ইবনুল আ’সের (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) চেয়ে অধিক জ্ঞানী ছিলেন। ইসলাম প্রচারের একেবারে শুরু দিকে আবু যর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ইসলাম গ্রহণ করেন, বাকি দুজন ইসলাম গ্রহণ করেন তাঁর চেয়ে প্রায় ২০ বছর পর।

খালিদ ইবনে ওয়ালিদ ও আমর ইবনুল আ’সের (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) নেতা ছিলেন, কিন্তু আবু যর আল-গিফারী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নেতা ছিলেন না; এমনকি আবু যর আল-গিফারী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কাছে একবার নেতৃত্ব চাইলে তাঁকে তিনি নেতা বানাননি। তাঁকে বুঝান- তুমি নেতৃত্বের জন্য নও।
অন্যদিকে, খালিদ ইবনে ওয়ালিদ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন একজন সফল নেতা, সফল সেনাপতি। তিনি ‘আমপারা’ মুখস্ত করেননি। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন:

“জিহাদে ব্যস্ত থাকার কারণে আমি কুরআন (খুব বেশি) মুখস্ত করতে পারিনি।”

কারো ডিগ্রি, সার্টিফিকেট না থাকলেও সে নেতা হতে পারে। অনেক্ষেত্রে এমন মানুষ দেখা যায়, ডিগ্রি আছে, কিন্তু বাস্তব সমস্যা সমাধান করতে পারে না।

বয়সে বড়ো দেখে কাউকে নেতা বানাবেন না

২। বয়সে বড়ো দেখে কাউকে নেতা বানাবেন না।
ইসলাম গ্রহণের ৫ মাসের মাথায় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘যাতুস সালাসিল’ অভিযানে আমর ইবনুল আ’সকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) সেনাপতি বানান। সেই অভিযানের নেতা ছিলেন আমর ইবনুল আ’স (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। তাঁর অধীনে ছিলেন আবু বকর, উমরের (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) মতো সিনিয়র সাহাবী।

সেই অভিযানে আমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কিছু ‘অদ্ভুত’ কাজ করেন; যা দেখে উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) ছিলেন তাঁর উপর কিছুটা বিরক্ত। উমর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আবু বকরকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) অভিযোগ করেন- “আপনি দেখছেন না আমর কী করছেন?” আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেন:
“দেখো উমর, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই অভিযানে তাঁকে নেতা বানিয়েছেন। এই অভিযানের জন্য নিশ্চয়ই তিনি তোমার চেয়ে যোগ্য।”

তাকওয়াকে নেতা নির্বাচনের শর্ত বানাবেন না

৩। তাকওয়াকে নেতা নির্বাচনের শর্ত বানাবেন না।
আপনি জানেন, কেউ হয়তো তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে, মসজিদে আস্তে-ধীরে সুন্নাত নামাজ পড়ে ইত্যাদি। এগুলো তার আমল, তাকওয়া নয়। তাকওয়া হলো বান্দার সাথে আল্লাহর একান্ত সম্পর্ক। তাকওয়ার অবস্থান অন্তরে, আমলে নয়। এমনও হতে পারে, একজন অনেক আমল করেন, কিন্তু তার তাকওয়া নেই।

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলকে (রাহিমাহুল্লাহ) একবার জিজ্ঞেস করা হলো, “আমরা সেই নেতার নেতৃত্বে কি যুদ্ধ করবো, যার তাকওয়া আছে কিন্তু শক্তি-সামর্থ্য নেই?
নাকি সেই নেতার নেতৃত্বে, যার তাকওয়া নেই কিন্তু শক্তি-সামর্থ্য আছে?”

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রাহিমাহুল্লাহ) জবাব দেন:
“যার তাকওয়া আছে, তার তাকওয়া তো তার নিজের জন্য। তার দূর্বলতা তার অনুসারীদের বিপদ ডেকে আনবে। অন্যদিকে, যার শক্তি-সামর্থ্য আছে কিন্তু তাকওয়া নেই, তার তাকওয়া না থাকাটা তাকে ক্ষতিগ্রস্থ করবে; তার অনুসারীকে নয়।”

কথাটি একেবারে পরিস্কার। আপনি একজনের দাঁড়ি-টুপি-জুব্বা দেখে তার সাথে মিছিলে গেলেন, তার না আছে মিছিলেন অভিজ্ঞতা, না আছে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা। পুলিশ যখন লাটিচার্জ করবে, সবার আগে সে আপনাকে ফেলে রেখে দৌড় দিবে। তার ব্যক্তিগত আমল রাজনীতির মঞ্চে তাকে যোগ্য বানাবে না; যদি না তার মধ্যে শক্তি-সামর্থ্য থাকে।
যখন তার শক্তি-সামর্থ্য থাকবে, তাকওয়াও থাকবে, তখনই সেটা ভালোর উপর ভালো, আলোর উপর আলো। কোন মানুষটি উম্মাহ এবং বর্তমান সমস্যার সমাধান করার সামর্থ্য রাখে, সেটা দেখুন। তার ব্যক্তিগত আমল-লিস্ট না।

বয়স দেখে নেতা বানাবেন না

৪। বয়স দেখে নেতা বানাবেন না।
এমপি হতে ৩০ বছর লাগবে, চেয়ারম্যান হতে ২৫ বছর লাগবে, স্কুল-মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি হতে এতো বছর লাগবে, সেনাপ্রধান হতে এতো বছর লাগবে এরকম কোনো শর্ত নেতৃত্বের জন্য জরুরি না।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন উসামা ইবনে যায়িদকে (রাদিয়াল্লাহু আনহু) একটি অভিযানের নেতা বানান, তখন তাঁর বয়স ছিলো সাড়ে সতেরো বছর।

তাঁর অধীনে যেসব সাহাবী ছিলেন, প্রায় প্রত্যেকেই ছিলেন তাঁর সিনিয়র। অনেকেই তাঁর বয়স নিয়ে অভিযোগ তোলেন। সবচেয়ে বড়ো অভিযোগ আসে উমরের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) কাছ থেকে। তিনি বলেন:
“রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন বালককে নেতা বানিয়েছেন!”

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর ইন্তেকালের তিনদিন আগে একটি ভাষণ দেন। সেই ভাষণে তিনি অনেকগুলো বিষয় নিয়ে কথা বলেন, তারমধ্যে এটা ছিলো একটি। তিনি বলেন:
“তোমরা উসামার (রাদিয়াল্লাহু আনহু) নেতৃত্বের ব্যাপারে আপত্তি করেছো। আল্লাহর কসম! সে জন্মগ্রহণ করেছে নেতা হবার জন্য; যেমন ছিলেন তাঁর বাবা যায়িদ ইবনে হারিসা (রাদিয়াল্লাহু আনহু)।”

উসামা ইবনে যায়িদের (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলী দেখে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে নেতা বানান। তাঁর বয়স বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। সাহাবীরা তাঁর বয়স নিয়ে আপত্তি তুললেও রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁদের আপত্তি মেনে নেননি।

শারীরিক শক্তি-সামর্থ্য দেখে নেতা বানাবেন না

৫। শারীরিক শক্তি-সামর্থ্য দেখে নেতা বানাবেন না।
কেউ দেখতে অনেক হ্যান্ডসাম হতে পারে, লম্বায় ৬ ফুট ২ ইঞ্চি হতে পারে, বডি সিক্স-প্যাক হতে পারে। দেখলে মনে হবে তার এক ঘুষির কাছে কেউ ঠিকতে পারবে না; এসব দেখে নেতা বানাবেন না। এগুলো নেতা হবার শর্ত না।

[কুয়েতের স্কলার শায়খ ড. তারিক আল-সুয়াইদানের লেকচার অবলম্বনে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নেতৃত্বের গুণাবলী নিয়ে ট্রেনিং প্রোগ্রাম, সেমিনারে তিনি বক্তব্য দেন।]

Show More

Related Articles

Leave a Reply, if you have comments about this post.

Back to top button
Islami Lecture