Writing

নিষ্পাপ মুখের হাসি

এক

আমার একটু ওই পারে নিয়া যাইবেন, আফা?
আয়েশার হাত ধরে অনুরোধের স্বরে বললো ছোট মেয়েটি।
আয়েশা দূর থেকে দেখছিলো মেয়েটি অনেককে অনুরোধ করছে। কিন্তু কেউই তার কথার পরোয়া না করে যার যার মতো ব্রিজ পার হয়ে চলে গেছে। মেয়েটি এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে পা কাঁপছে তার।
মেয়েটির চেহারার দিকে তাকিয়ে খুব মায়া হয়েছিল আয়েশার।

সে তাকে হাত ধরে পার করে দেয়। পার হওয়ার পর মেয়েটি দৌড়ে তার বাবার কাছে চলে যায় ও পেছনে ফিরে আয়েশার দিকে একঝাঁক আনন্দমাখা হাসি দেয়। কত বছর হয়েছে এমন হাসি দেখেনি আয়েশা। এক নিষ্পাপ মুখের হাসি।

যে হাসিতে নেই কোন সীমাবদ্ধতা, নেই কিছু হারানোর ভয়। মেয়েটির পরনের ধুলোমাখা জামাকাপড় দেখে সবাই তাকে দূরে ঠেলে দিয়েছিল। আজ যদি মেয়েটা কোন বড়লোকের সন্তান হতো তাহলে কেউ তাকে উপেক্ষা করতো না বরং বলার আগেই তার হাত ধরে পার করে দিতো। কথাগুলো আওড়াতে আওড়াতে হাঁটতে লাগলো আয়েশা।

দুই

মা, আমার অনেক ক্ষুধা লাগছে। কিছু খাওনা দেও না। কতদিন হইছে কিছু খাই না। কাকুতিমিনতি করে বলছিলো মরিয়ম।
মেয়ের এমন কাকুতিমিনতি মাখা কন্ঠস্বর শুনে খুব কষ্ট হচ্ছিলো জমিলা বেগমের।
জমিলা বেগম ও তার মেয়ে মরিয়ম রেললাইনে থাকে। আজ থেকে প্রায় পাঁচ বছর আগে এক্সিডেন্ট করে তার স্বামী মারা গিয়েছে। তখন মরিয়মের বয়স ছিল দেড় বছর। স্বামী মারা যাওয়ায় শ্বশুর বাড়ির লোকজন তাদের সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয়। তারপর তাদের ঠাঁই হয় কমলাপুর রেলস্টেশনে।

আজ তিনদিন হলো জমিলা বেগম মেলা অসুস্থ। তাই ভিক্ষা করতে যেতে পারেন না। যার ফলে না খেয়েই দিনাতিপাত করতে হচ্ছে তাদের। অভুক্ত মেয়েটির শুষ্ক মুখের দিকে তাকালে তার চোখ ছলছল করে উঠে। নিজে না খেয়ে থাকতে পারলেও তার মেয়েটি তো বাচ্চা মানুষ। সে কি পারে এতোদিন না খেয়ে থাকতে!

তিন

ভিক্ষা করতে গেলে কতো মানুষ কত ধরনের কথা বলে। কেউ দূরদূর করে তাড়িয়ে দেয় আবার কেউবা সৌহার্দপূর্ণ মনোভাব নিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। এই পাঁচ বছরে কত ধরনের মানুষ দেখার সুযোগ হয়েছে জমিলা বেগমের।
স্বামী মারা যাওয়ার পর যখন শ্বশুর বাড়িতে ঠাঁই হয়নি তখন চিন্তায় পাগলপ্রায় হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। এইটুকু বাচ্চাকে নিয়ে কার দাঁড়ে গিয়ে দাঁড়াবেন তিনি। মুনাজাতে কত অশ্রু ঝরিয়েছেন তাতো কেবল রবই জানেন।

তিনিই তাকে সাহায্য করেছেন। এখন কোনমতে মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে তাদের। দু’বেলা দুমুঠো খেতেও পারেন। এর থেকে আর বেশি কিছু সে কোনদিন চায় ও নি রবের কাছে।
তারপরও মাঝেমাঝে মেয়েটি যখন আবদার করে কিছু চায় তার কাছে তখন তার খুব কষ্ট হয়। কারণ তার তো সামর্থ্য নেই মেয়ের শখ-আহ্লাদ পূরণ করার। সব বাবা-মাই তো চায় তার সন্তানের শখ-আহ্লাদ পূরণ করতে। কিন্তু তিনি তো অসহায়। কিছু করার নেই তার।

চার

রেললাইনের পাশে কনফেকশনারির দোকান থেকে বার্গার কিনছে খাদিজা বেগম ও তার চার বছর বয়সী মেয়ে আফিফা। মেয়ে আঙ্গুলের ইশারায় দেখিয়ে দিচ্ছে সে বার্গারই খাবে। অনেকদিন ধরে বার্গার খাওয়ার জন্য বায়না ধরছে সে। কিন্তু অভাবগ্রস্থ মা অর্থের অভাবে তার চাহিদা পূরণ করতে পারে নি।
গার্মেন্টসে চাকরি করে খাদিজা বেগম। স্বামী শয্যাশায়ী। ছয়মাস যাবত প্যারালাইসিস হয়েছে তার। খাদিজার বেতন দিয়ে তার চিকিৎসা করতে হয় সাথে সংসার ও চালাতে হয়। এ নিয়ে বেশ বেগ পেতে হয় তাকে। এদিকে মেয়েটা ছোট। মাঝেমাঝেই এটা-সেটা খাওয়ার বায়না ধরে।

অনেকদিন ধরেই বার্গার খাবো, বার্গার খাবো বলে বায়না ধরেছে আফিফা। তাই আজ বেতন পেয়ে সাথেসাথে মেয়েকে নিয়ে চলে এসেছে কনফেকশনারিতে। তাদের দুজনের জন্য দু’টো বার্গার নিয়েছে সে। স্বামী প্যারালাইসিস রোগী হওয়ায় তাকে সবসময় তরল খাবার খাওয়াতে হয়। তাই দু’টোই নিয়েছে।
কেনাকাটা শেষে প্যাকেট হাতে রেললাইন ধরে হাঁটা শুরু করেছেন আফিফা ও খাদিজা বেগম। মরিয়ম দূর থেকে তাদের বার্গার কিনতে দেখেছিলো। ক্ষুধায় কাতর মেয়েটির কাছে তখন এক পিস পাউরুটির মূল্যও অনেক বেশি। ক্ষুধায় শরীর কাঁপছিলো তার।

পাঁচ

আফা, আমরা আইজকা লইয়া তিনদিন না খাইয়া আছি। আমার মায় অসুস্থ। আমাগোরে একটু খাওন দিবেন?
হাত বাড়িয়ে জমিলা বেগমের কাছে সাহায্য চাইলো মরিয়ম।
মেয়েটির শুষ্ক মুখখানা দেখে তিনি অশ্রু আটকে রাখতে পারেন নি। তার কাছে যে টাকা অবশিষ্ট আছে তা দিয়ে তো তার স্বামীর ঔষধ কিনতে হবে। তাছাড়া পুরোটা মাস এখনও পড়ে আছে। তার কাছে এখন এক টাকার মূল্যও হাজার টাকার সমান।
কিন্তু তিনি তো মেয়েটিকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতে পারেন না। অনেক চিন্তাভাবনা করে তার হাতের বার্গারের প্যাকেটটি তার মেয়েকে দিয়ে বললেন, যাও এই প্যাকেটটা ওকে দিয়ে এসো।

মেয়েটা বললো, ওকে দিয়ে দিলে আমরা কী খাবো?
আমি তোমাকে কয়েকদিন পর কিনে দিবো, কেমন?
আমরা তো প্রতিদিন খেতে পারি, মা। কিন্তু ওই মেয়েটাকে দেখো। ওরা তিনদিন না খেয়ে আছে। ওর যে অনেক কষ্ট হচ্ছে। আল্লাহ চাইলে আমরা খুব শিঘ্রই বার্গার খেতে পারবো।

মায়ের কথায় রাজি হয়ে গেলো মেয়েটি। ছোটকাল থেকেই মেয়েকে ভাল-মন্দ শেখানোর চেষ্টা করেন তিনি। যাতে করে বড় হয়ে সব পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে পারে সে।
মেয়েটি দৌড়ে গিয়ে প্যাকেটটি মরিয়মের হাতে দিয়ে এলো।
মরিয়ম প্যাকেটটি পেয়ে খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়।
খাদিজা বেগম দূর থেকে তার নিষ্পাপ মুখের হাসি দেখে আড়ালে চোখ মুছে আবার হাঁটা ধরেন তার গন্তব্যস্থলে।

লিখেছেন

  • লেখা পড়া করছি অনার্স ৩য় বর্ষ এবং পাশাপাশি আইওএম এ আলিম প্রিপেরটরি কোর্স করতেছি।
    স্পষ্টভাষী • তলিবিল ইলম • দাঈ ইলাল্লাহ

    View all posts

Show More

Related Articles

Leave a Reply, if you have comments about this post.

Back to top button