Writing

ভালোবাসা মানে কি

পার্কে বসে প্রেমিকার হাতে হাত ধরে বাদাম চিবানোর নাম কি ভালোবাসা? রাতভর গার্লফ্রেন্ড সাথে ফুসুরফাসুর কথা বলার নাম কি ভালোবাসা?
কোনো মেয়েকে পাওয়ার জন্য হাতে, বুকে, গলায় রক্ত ঝরানোর নাম কি ভালোবাসা? কিংবা কোনো ছেলের জন্য নিজের হায়া সম্ভ্রমকে তুলে দেওয়ার নাম কি ভালোবাসা?

ফেসবুকে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস দিয়ে দুই তিন মাসের প্রেম প্রেম খেলা করার নাম কি ভালোবাসা?
পাগলের মতো চিৎকার করে— “তোকে ছাড়া বাঁচবো না আমি…” বলার নাম কি ভালোবাসা?”
প্রেমিকার ঠোঁটে, চোখে, মুখে, চুড়িতে, শাড়িতে, কপালে, ভ্রুতে, তিলে… সৌন্দর্য খোঁজার নাম ভালোবাসা?

বয়ফ্রেন্ডকে কে খুশি করতে গিয়ে বাবা-মায়ের বুকে ছুড়ি বসানোর নাম কি ভালোবাসা?
নাকি ভালোবাসা দিবসের নামে আড়ালে আবডালে নোংরামো করার নাম ভালোবাসা?

বস্তুত এগুলো একটাও ভালোবাসা নয়। ভালোবাসা নামে ভণ্ডামি, এগুলো হলো ভালোবাসা নামক শব্দটার অপপ্রয়োগ, এগুলো হলো ভালোবাসা অপাত্রে বিলিয়ে দেওয়ার অন্ধকারাচ্ছন্ন সুড়ঙ্গ, যার কোনো ভিত্তিই নেই। এবং রীতিমতো অন্যায়।

তাহলে ভালোবাসা মানে কী?
একটু ভাবুন।

ভালোবাসা শব্দটা যিঁনি সৃষ্টি করেছেন, ভালোবাসার অনুভূতিটা যিঁনি সৃষ্টি করেছেন, ভালোবাসা নামক বিশেষ গুণটির জন্য যিনি ডিএনএ ডিজাইনে চমৎকার সব মেকানিজম ঢেলে সাজিয়েছেন। যাঁর কারণেই না মা ভালোবাসে তার সন্তানকে, আবার সন্তান ভালোবাসে তার মাকে। হাতি হাতির বাচ্চাকে ভালোবাসে, হিংস্র বাঘ তার সন্তানকে ভালোবাসে, মুরগী মুরগীর বাচ্চাকে ভালোবাসে, আগলে রাখে।
সমস্ত প্রাণী জগত, মানব জগতের হৃদয়ের ভেতর যাঁর কারণে উথলে ওঠে ভালোবাসা নামক ব্যাপারটা। তাকে বাদ দিয়ে শুধু তার সৃষ্টির ভেতর নিজেকে সঁপে দেওয়া, নিজেকে কোরবান করে দেওয়া, হাত কাটা, পা কাটা, সুইসাইড করা কিভাবে ভালোবাসা হতে পারে?

যিঁনি আসমান জমিনের প্রতিটি অনু-পরমাণু সাজিয়েছেন, যিঁনি চন্দ্র সূর্য বানিয়েছেন চমৎকার ভারসাম্যের উপর, যিঁনি প্রতিটি মূহুর্তে আমাদের আগলে রেখেছেন মহাজাগতিক ক্ষতিকর রশ্মি থেকে, যিঁনি প্রতিটি মূহুর্তে আমাদের লাখো কোটি ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া থেকে বাঁচিয়ে রাখছেন, অহরহ গুনাহ করার পরও সকালে খাওয়া বন্ধ করেননি, দুপুরের লান্স বন্ধ করেননি, রাতের ডিনারও বন্ধ করে দেননি!

যিঁনি নীল আকাশের সব নক্ষত্র একাই বানিয়েছেন, যিঁনি সমগ্র মহাবিশ্বের সবকিছু আমাদের জন্য বানিয়েছেন, যিঁনি প্রতিটি দিন অক্সিজেন দিয়ে আমাদের টিকিয়ে রাখার ব্যাবস্থা করেছেন, যিঁনি ওজন স্তরকে বানিয়ে অতিবেগুনী রশ্মি থেকে আমাদের বাচিঁয়ে দিয়েছেন, যিঁনি বায়ুমন্ডল সৃষ্টি করে মেঘের ব্যাবস্থা করে দিয়েছেন!

যিঁনি আমাদের সহজে খাওয়ার জন্য কলার উপর প্যাকেট সিস্টেম করে দিয়েছেন, যিঁনি পেয়ারা-আম সহ সকল ফলমূলের উপর খোসার ব্যাবস্থা করে দিয়েছেন, যিনি হাজারো রক্তবিন্দুর জন্য অসংখ্য শিরা-উপশিরা বানিয়েছেন, যিঁনি মস্তিষ্কের কোটি কোটি নিউরন বানিয়েছেন, যিঁনি চোখের উপর ভ্রু দিয়েছেন, যিঁনি মুখমন্ডলকে সৌন্দর্যমন্ডিত করে বানিয়েছেন, দাঁতকে সাদা বানিয়েছেন, চোখকে কালো বানিয়েছেন, সুসামঞ্জস্যপূর্ণ যার প্রতিটি সৃষ্টি, প্রতিটি স্থান, প্রতিটি জীব, প্রতিটি মানুষ। তাঁকে বাদ দিয়ে এ আমরা কার প্রেমে জীবনটাকে সঁপে দেই।

আপনার প্রেমিক/প্রেমিকা কি এমন দিয়েছে যার জন্য আপনি তার হাতে জীবন তুলে দিতেও প্রস্তুত! একবার তাকে জিগ্যেস করেই দেখুন না, আপনি ফকির এবং কুৎসিত চেহারার হয়ে গেলে সে আপনাকে টেককেয়ার করবে কি-না! দেখবেন মুখের বুলি ঝারলেও বাস্তবে ভালোবাসা তখন জানালা দিয়ে পালাবে!

কাজেই, যাঁর থেকে সকল ভালোবাসা উৎসারিত হয় তাকে ভালোবাসার নামই তো হলো প্রকৃত ভালোবাসা। তাঁর জন্য সবকিছু উৎসর্গ করে দেওয়ার নামই তো ভালোবাসা। তাঁর জন্য হৃদয়ে রক্তক্ষরনের নামই ভালোবাসা। তাঁর জন্য আঘাতে আঘাতে দিলটাকে ভাঙার নাম ভালোবাসা। তাঁর জন্য কবিতা লেখার নাম ভালোবাসা। তাঁর জন্য লেখালেখি করার নাম ভালোবাসা। তাঁর জন্য বেগানা মেয়ে থেকে দৃষ্টি হেফাজতের নাম ভালোবাসা। তাঁর জন্য ফোন থেকে সব গান ডিলিট করার নাম ভালোবাসা। তাঁর জন্য ফেসবুকে মেয়েদের আনফ্রেন্ড করার নাম ভালোবাসা। তাঁর জন্য অনর্থক আড্ডাবাজি না করার নাম ভালোবাসা।

তাঁর জন্য হারাম রিলেশন থেকে বেঁচে থাকার নাম ভালোবাসা। তাঁর জন্য বাবা-মায়ের হক আদায়ের নাম ভালোবাসা। তাঁর জন্য স্ত্রীর হক আদায়ের নাম ভালোবাসা। তাঁর জন্য বান্দার হক আদায়ের নাম ভালোবাসা। তাঁর জন্য নবী (সঃ) থেকে শুরু করে সমস্ত মুসলমান ভাই-বোনদের ভালোবাসার নাম হলো ভালোবাসা। তাঁর জন্য কাউকে ভালোবাসার নাম ভালোবাসা। তাঁর জন্য কাউকে ঘৃণা করার নাম ভালোবাসা। গুনাহ ত্যাগ করার নাম ভালোবাসা। তাঁর জন্য সিগারেট, মদ, গাঁজা ছেড়ে দেওয়ার নাম ভালোবাসা। তাঁর জন্য প্রিয় খেলাটা থেকে ছুটি নিয়ে মসজিদনামাজ পড়তে আসার নাম ভালোবাসা।

কখনো কি মহান রাব্বে কারিমকে i love u বলেছেন? কখনো কি তাঁর জন্য কেঁদে কেঁদে হৃদয় উজাড় করে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন? কখনো কি প্রচন্ড বৃষ্টিতে ভেজার সময় আবেগে আপ্লূত হয়ে তাকে ভালোবাসার কথাগুলো জানিয়েছেন? যিঁনি চমৎকার বৃষ্টি বর্ষন করালেন! মধুমাখা জ্যোৎস্নায় চাঁদের দিকে দাঁড়িয়ে কখনো কি তাঁর কথা মনে হয়েছে? যিঁনি এতো চমৎকার জ্যোৎস্না নামালেন! একটা আপেল বা কমলা খাওয়ার সময় তাঁর কথা কি মনে হয়েছে? যিঁনি এর রং, গন্ধ, স্বাদে ভরপুর করেছেন! কখনো কি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর জন্য ভালোবাসা জেগেছে? যিঁনি আপনাকে সুসামঞ্জস্যপূর্ণ ভাবে নিখুঁত মেকানিজমে সবার থেকে আলাদা গঠনে বানালেন!

হায় আফসোস! তাঁকে ভালোবাসতে গিয়ে কোথায় আমাদের আটকাচ্ছে! কিসে আমাদের ধোঁকা দিচ্ছে। কেন আমরা তাঁর থেকে এত দূরে? অথচ তিঁনি কতো সুন্দর ভাবে, ভালোবাসার সুরে আমাদেরকে তার কাছে ডাকার উদ্দেশ্যে বলছেন –

“হে আমার বান্দারা, কোন জিনিস তোমাকে তোমার মহান প্রতিপালক সমন্ধে তোমায় ধোঁকায় ফেলে দিলো? তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর সুগঠিত করেছেন,(করেছেন প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও গুণাবলিতে সমৃদ্ধ) ও তোমাকে সুসামঞ্জস্যপূর্ণ করেছেন।” –
[সূরা ইনফিতার: ৬; ৭]

তাই আসুন ভালোবাসা দিবসের সকল অশ্লীলতা পরিহার করে সেই রবের দিকে হাত বাড়াই। একটাবার বাড়িয়েই দেখুন না! আপনার সমস্ত কালিমা ধুয়ে মুছে তিঁনি আপনাকে আপন করে নিবেন!

লিখেছেন

আরিফ আব্দুল্লাহ

আরিফ আব্দুল্লাহ

লালমনিরহাট সরকারি কলেজের বাংলা ডিপার্টমেন্ট অনার্স ৩য় বর্ষে পড়াশোনা করছি।
আমার জীবন মরন সবকিছু স্রষ্টার জন্য

লেখকের অন্যান্য সকল পোষ্ট পেতে ঘুরে আসুন

লালমনিরহাট সরকারি কলেজের বাংলা ডিপার্টমেন্ট অনার্স ৩য় বর্ষে পড়াশোনা করছি।
আমার জীবন মরন সবকিছু স্রষ্টার জন্য

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Islami Lecture