জানাযার নামাজ (পর্ব-৩)

যখন রাসুল (ﷺ) ইন্তেকাল করলেন, আয়েশার (রা:) চিৎকার শুনে ফাতিমা (রা:) বুঝতে পারলেন তাঁর পিতা মুহাম্মাদ (ﷺ) মারা গেছেন। তখন তিনি এই সুন্দর কথাগুলি বলেছিলেন –
ياأبَتاه، مِن رَبِّه ما أَدْناه –
হে আমার প্রিয় বাবা, আপনি আপনার পালনকর্তার কতই না নিকটবর্তী।
ياأبَتاه، إلى جِبرائيلَ أَنْعاه –
জিব্রাইলের (আ:) কাছে আমরাও আপনার মৃত্যু ঘোষণা করছি।
ياأبَتاه، جَنَّةُ الفِردَوْسِ مَأْواه –
হে আমার প্রিয় বাবা, আপনি এখন জান্নাতুল ফেরদৌসের বাসিন্দা।

একজন ব্যক্তি মারা যাচ্ছে সেটা উপলব্ধি করা এবং বাস্তবে আত্মা তার দেহ ছেড়ে চলে যাচ্ছে সেটা অবলোকন করা – দুটি ভিন্ন বিষয়। এখন আসছে মৃতকে গোসল দেওয়ার ব্যাপারটি। যারা মৃতকে গোসল দিয়েছেন তাঁরা জানেন, পরিচিত কোন মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়া, অপরিচিত একজন মৃত ব্যক্তিকে গোসল দেওয়ার চেয়ে অনেক আলাদা।

আপনি যখন আপনার পরিচিত কাউকে দাফনের জন্য গোসল দেন, তখন আপনি এই ক্ষণস্থায়ী জীবনের প্রবঞ্চনা উপলব্ধি করতে পারেন, কারণ আপনার সামনে একটি নিষ্প্রাণ নিথর দেহ শুয়ে আছে। আপনি সেই ব্যক্তিকে ঘুরে বেড়াতে দেখেছেন, আপনি হয়তো সেই ব্যক্তির কাছাকাছি ছিলেন, হয়তো সে ছিল পরিবারের একজন সদস্য যাকে আপনি ভালোবাসতেন। এখন আপনি তাকে নিষ্প্রাণ শুয়ে থাকতে দেখছেন।

যখন আপনি মৃত দেহের দিকে তাকিয়ে আছেন, মনে মনে আপনি হয়তো সত্যিই তার জীবনের শেষ মুহূর্তগুলিকে লালন করতে চাইছেন। আপনি তার কপালে চুম্বন করতে পারেন, যেমন আবু বকর (রা:) শেষবারের মতো রাসুলের (ﷺ) মৃত্যুর পর তাঁর কপালে চুম্বন করেছিলেন। রাসুলও (ﷺ) উসমান ইবনে মাদহুনের সাথেও একই কাজ করেছিলেন, তিনি তাঁর দিকে তাকিয়ে থেকে আরও একবার তাঁর কপালে চুম্বন করেছিলেন।

পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজটি হলো মৃত ব্যক্তির মুখে মাটি ছিটানো। সুবহানাল্লাহ! একের পর এক পরিক্রমা গুলো সংঘটিত হতে থাকে। প্রথমে আপনি দেখলেন আত্মা তার শরীর ছেড়ে চলে যেতে, তারপর আপনি মৃতকে গোসল করালেন, তার চুল আচড়ে দিলেন, মৃতের গায়ে সুগন্ধি লাগালেন, হয়তো আরো একবার তার কপালে চুমু খেলেন, এভাবে শেষ মুহূর্ত গুলো আপনি অনুভব করলেন। এরপর সসম্মানে মৃত্যুর মুখে মাটি ছিটালেন।

কাজটি কিন্তু সহজ নয়, বস্তুত ফাতিমা (রা:) রাসুলের (ﷺ) দাফনের পর আনাস ইবনে মালিককে (রা:) জিজ্ঞাসা করেছিলেন কেমন ছিল সেই অভিজ্ঞতা, কারণ রাসুলের (ﷺ) মুখে মাটি ছিটানো এবং তাঁকে দাফন করার ব্যাপারটা একবার চিন্তা করুন, কল্পনা করুন এই কাজটি করেছিলেন আনাস (রা:), যিনি দীর্ঘদিন অন্তরঙ্গভাবে রাসুলের (ﷺ) সঙ্গ উপভোগ করেছেন।

তাই ফাতিমা (রা:) আনাসের (রা:) কাছে গিয়ে বলেছিলেন –
أطابت أنفسكم أن تحثّوا عليه التراب”؟ –
“কেমন করে আমার বাবার মুখে মাটি নিক্ষেপ করলেন?” এ ছিল তাঁর মানবিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ। “কেমন করে পারলেন তাঁকে কবর দিতে? তাঁর মুখে মাটি দিতে?
কিভাবে সক্ষম হলেন?”
আনাস (রা:) বলেন, আমি তাঁকে বললাম “والله انكقرنا قلوبنا – আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমাদের হৃদয়কে অস্বীকার করে তা করেছি, অনুভুতিকে অসাড় করে এ কাজ করতে সক্ষম হয়েছি। রাসুলকে (ﷺ) কবরে নামিয়ে তাঁর মুখে মাটি নিক্ষেপ করেছি।”

অবশ্যই কাজটি সহজ নয়। এটি কেবল রাসুলের ক্ষেত্রেই নয়,আমাদের
প্রিয়জনদের ক্ষেত্রেও সত্য। তবে অবশ্যই রাসুলের (ﷺ) প্রতি সাহাবীদের ভালবাসা আমাদের প্রিয়জনদের প্রতি আমাদের ভালোবাসার চেয়ে আরো অনেক অনেক বেশি।

জানাযার পর লাশ দ্রুত কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া সুন্নত। এটি একটি খুব দ্রুত প্রক্রিয়া – অন্তত এ প্রক্রিয়াটি দ্রুততার সাথে হওয়া উচিত। দিনের পর দিন লাশ ফেলে রাখতে হয় না। খুব বেশি আনুষ্ঠানিকতার দরকার নেই – জানাজায় শামিল হওয়া, এবং তারপর যত দ্রুত সম্ভব দাফন করা, এইতো।

প্রকৃতপক্ষে কিছু সাহাবা উল্লেখ করেছেন যখন সাদ ইবনে মুয়াজ (রা:) ইন্তেকাল করলেন, আমরা তাঁর জানাজার অনুসরণ করেছিলাম। রাসুল (ﷺ) এবং সাহাবারা এত দ্রুত হাঁটছিলেন যে তাদের পা থেকে জুতা খুলে আসছিল। কারণ তারা দ্রুত জানাজার অনুসরণ করেছিলেন, এবং এটাই রাসুলের (ﷺ) সুন্নত

পূণ্যবানের আত্মা কবরের জন্য অপেক্ষা করে। একজন নেক লোকের আত্মা তখন বলতে থাকে, ‘আমাকে দ্রুত নিয়ে যাও।’ বিপরীতে খারাপ লোকের আত্মা তখন বলতে থাকে, ‘আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছো?’ কাজেই একজন পূণ্যবান ব্যক্তির মৃতদেহ কবরস্থ করার জন্য দ্রুত কবরস্থানে নিয়ে যান, এক্ষেত্রে বিলম্ব করবেন না।

সুন্নত হল মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা এবং বলা – بسم الله وعلى سنة رسول الله – আল্লাহর নামে এবং রাসূলের সুন্নতের উপর। আপনি এটাও বলতে পারেন – اللهم اغفر له اللهم ثبته – হে আল্লাহ আপনি তাকে ক্ষমা করে দেন, তাকে দৃঢ় রাখুন। মৃতদেহকে কবরে নামানোর সময় এই দু’য়া গুলো আপনি করবেন।

সমাধি (পর্ব : ৩)
মূল: ড. ওমর সুলাইমান

লিখেছেন

ফাহমিনা হাসানাত

কিছুটা লেখালেখি করি, ইসলামিক লাইনে কিছুটা পড়াশোনা করি। তাজউইদ, গ্রামার এবং কুরআন মেমোরাইজেশন এর ক্লাস করছি আলহামদুলিল্লাহ।
নিজে শিখছি, অন্যকেও শিখাচ্ছি। লেখালেখিটাও ঠিক এরকম। নিজে জানার জন্য মনের আনন্দে লিখি, শেয়ার করি।

লেখকের অন্যান্য সকল পোষ্ট পেতে ঘুরে আসুন

কিছুটা লেখালেখি করি, ইসলামিক লাইনে কিছুটা পড়াশোনা করি। তাজউইদ, গ্রামার এবং কুরআন মেমোরাইজেশন এর ক্লাস করছি আলহামদুলিল্লাহ।
নিজে শিখছি, অন্যকেও শিখাচ্ছি। লেখালেখিটাও ঠিক এরকম। নিজে জানার জন্য মনের আনন্দে লিখি, শেয়ার করি।

Exit mobile version