Writing

কখনো হতাশ হবে না

সুবহানাল্লাহ, ওমর (রা:) সম্পর্কে অনেক গল্প আমরা জেনেছি। আজকের গল্পটি ওমরকে (রা:) কেন্দ্র করে না হলেও, ওমর (রা:) এই গল্পের সাথে জড়িত। বস্তুত, তথ্যসমৃদ্ধ এই হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ওমর (রা:)। হিজরতের সময় একদল সাহাবীর সাথে কোন এক জায়গায় সাক্ষাৎ করার জন্য তিনি রাজি হয়েছিলেন। হিজরতের জন্য তাদের বেরিয়ে পড়তে হয়েছিল, গল্পের পরের অংশটুকু খুব আকর্ষণীয় যা কুরআনের সাথে সম্পর্কিত।

ওমর ইবনে খাত্তাব (রা:) বলেন: ‘যখন আমরা হিজরত করতে যাচ্ছিলাম, তখন দুই সাহাবী আয়াশ ইবনে আবি রাবিআহ (রা:) এবং হিশাম ইবনুল আসের (রা:) সাথে একমত হয়েছিলাম যে আমরা সারিফ উপত্যকার পিছনে বনু গাফফারের ভূমিতে একত্রিত হব। মদিনায় পালিয়ে যাবার উদ্দেশ্যে যদি তারা সেখানে উপস্থিত হতে ব্যর্থ হয়, তবে তাদের ছাড়াই আমরা এগিয়ে যাব, এবং সবাই এই সিদ্ধান্তে একমত হয়েছিলাম। আমরা যখন বানু গাফফারের এলাকায় পৌঁছলাম, তখন আয়াশ ইবনে আবি রাবিআহকে (রা:) দেখতে পেলাম, এবং জানতে পারলাম হিশাম ইবনুল আসকে (রা:) আটকে রাখা হয়েছে এবং তাকে তার ধর্ম ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে।

সুতরাং দুজন সাহাবার একজনকে আটকে রাখা হয়েছে, এবং শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। নির্যাতনের মুখে তিনি ধর্ম পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। বাকি থাকলেন ওমর (রা:) এবং আয়াশ ইবনে আবি রাবিআহ (রা:)। ওমর (রা:) বলেন: ‘সুবহানাল্লাহ, আমরা মদিনার খুব কাছাকাছি এসে পৌঁছেছিলাম, আমরা কুবায় এসে পৌঁছলাম এবং বানু আমর ইবনে আউফের গোত্রের কাছে অবস্থান করলাম। যখন আমরা কুবায় প্রায় পৌঁছে গিয়েছিলাম, তখন আবু জাহাল এবং হারিস ইবনে হিশাম পিছু নিয়েছিল সাহাবা আয়াশ ইবনে আবি রাবিআহর (রা:)। কিন্তু কেন?
আয়াশ ইবনে আবি রাবিআহ (রা:) ছিলেন আবু জাহালের সৎ ভাই এবং সম্পর্কে তিনি তার চাচাতো ভাইও।

আবু জাহাল আয়াশ ইবনে আবি রাবিআহকে (রা:) বলল: ‘দেখো তোমার মা শপথ করেছেন যে তোমাকে দেখতে না পাওয়া পর্যন্ত তিনি মাথায় চিরুনি স্পর্শ করবেন না, এবং বাহিরে সূর্যের তাপে দাঁড়িয়ে থাকবেন, ছায়া গ্রহণ করবেন না।’ কাজেই আয়াশ ইবনে আবি রাবিআহর (রা:) মা অনশন অবলম্বন করছেন এবং নিজেকে নির্যাতন করছেন, তিনি মাথায় চিরুনিও স্পর্শ করছেন না। সেই সময় উকুনের উপদ্রব খুব বেশি ছিল। আয়াশ ইবনে আবি রাবিআহকে (রা:) না দেখা পর্যন্ত আর মা ব্রত ত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।

আয়াশ (রা:) সত্যিই তার মাকে ভালোবাসতেন। যখন লোকেরা ইসলামে ধর্মান্তরিত হয় তখন বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি হল পিতামাতার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার অনুভূতি। তাই আয়াশ (রা:) তার মায়ের প্রতি করুনা বোধ করলেন। ওমর ইবনে খাত্তাব (রা:) তাকে বললেন, ‘দেখুন আমি জানি আপনার লোকজন এবং আপনার নিকট আত্মীয়রা কি করছে, তারা চাইছে আপনি আপনার ধর্ম ত্যাগ করেন। কাজেই সাবধান!’ আয়াশ (রা:) বললেন, ‘আমি আমার মাকে তার প্রতিজ্ঞা পূরণে সাহায্য করতে চাই, আমি আমার মায়ের কাছে যেতে চাই এবং আসার সময় কিছু টাকাও নিয়ে আসতে চাই।’

আয়াশ (রা:) বললেন, ‘চিন্তা করবেন না, আমি সুরক্ষিত অবস্থায় যাব, প্রয়োজনীয় টাকা নিয়েই আমি আবার ফিরে আসবো যা পালানোর সময় আমি আনার সুযোগ পায়নি। ওমর (রা:) বললেন, ‘শুনুন আল্লাহ শপথ করে বলছি, সূর্যের উত্তাপ যখন প্রখর হবে আপনার মা ঘরে ফিরে আসবেন, উকুনের উপদ্রব যখন প্রবল হবে তিনি তার ব্রত ত্যাগ করবেন। এছাড়া আপনি তো জানেন আমার অঢেল টাকা আছে, আমি কুরাইশদের অন্যতম ধনীদের একজন। আপনি চাইলে আমার অর্ধেক টাকা আপনাকে দিয়ে দিব। আপনার মাকে নিয়ে চিন্তা করবেন না, তিনি ঠিক হয়ে যাবেন, কাজেই আপনি ফাঁদে পা দিবেন না।’ কিন্তু আয়াশ (রা:) বললেন, ‘আমাকে যেতে দিন, আমার মায়ের সাথে দেখা করতে দিন, আমি ঠিকই টাকা নিয়ে ফিরে আসবো।’

ওমর (রা:) তাঁর উট থেকে নামলেন এবং উটটি আয়াশকে (রা:) দিয়ে বললেন, ‘এটি খুব দ্রুত একটি উট, কোন অবস্থাতেই আপনি এই উট থেকে নামবেন না। আপনাকে কেউ ধরতে চাইলে আপনি সহজেই এই উটে চড়ে পালিয়ে যেতে পারবেন।’ উটটি ছিল আবু জাহাল এবং হারিসের উটের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুতগামী। যাইহোক, আয়াশ (রা:) ওমরের (রা:) প্রস্তাবে রাজি হলেন। আয়াশ (রা:) আবু জাহাল এবং হারিসের পাশাপাশি উটে চড়ে যাচ্ছিলেন। আবু জাহাল আয়াশকে (রা:) বললেন, ‘দেখো আমার উটটি খুব ধীরগামী, আমার উটটিকে তোমার উটের সাথে বেঁধে দিলে আমরা দ্রুত এগিয়ে যেতে পারবো। ওমরের ( রা:) নিষেধ সত্ত্বেও আয়েশ (রা:) তার ভাইয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলেন।

আয়াশ (রা:) উট থেকে নেমে পড়লেন এবং তিনি নামার সাথে সাথেই আবু জাহাল এবং আল হারিস তাকে আক্রমণ করে এবং তাকে বেঁধে রাখে। তারা তাকে মক্কায় ফিরিয়ে আনে এবং ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করতে বাধ্য করে। ওমর (রা:) বলেন, ‘আমরা যখন মদিনায় ছিলাম তখন আমরা এই ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারলাম। আমরা ভেবেছিলাম যে তাদের বুঝি আর কোন আশা নেই, অর্থাৎ আমরা ভেবেছিলাম কেউ একবার ইসলাম ত্যাগ করলে সে আর ফিরে আসতে পারবে না, এটি এমন একটি কাজ যা আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা কখনই ক্ষমা করবেন না। আমাদের ধারণা এমনই ছিল যতক্ষণ না আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা সূরা যুমারের (২৩ পারার ৩৯ নং সূরা) ৫৩ নং আয়াত নাজিল করেন।

قُلۡ یٰعِبَادِیَ الَّذِیۡنَ اَسۡرَفُوۡا عَلٰۤی اَنۡفُسِهِمۡ لَا تَقۡنَطُوۡا مِنۡ رَّحۡمَۃِ اللّٰهِ ؕ اِنَّ اللّٰهَ یَغۡفِرُ الذُّنُوۡبَ جَمِیۡعًا ؕ اِنَّهٗ هُوَ الۡغَفُوۡرُ الرَّحِیۡمُ
বল, ‘হে আমার বান্দাগণ, যারা নিজদের উপর বাড়াবাড়ি করেছ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। অবশ্যই আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’।
[৩৯:৫৩]

اَنِیۡبُوۡۤا اِلٰی رَبِّکُمۡ وَ اَسۡلِمُوۡا لَهٗ مِنۡ قَبۡلِ اَنۡ یَّاۡتِیَکُمُ الۡعَذَابُ….
তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের অভিমুখী হও আর তাঁর অনুগত হও তোমাদের কাছে ‘আযাব আসার পূর্বে….
[৩৯:৫৪]

ওমর (রা:) বলেন, ‘যখন এই আয়াত দুটি নাযিল হলো, তখন আমি তা একটি পাতায় লিখে চিঠি হিসাবে পাঠিয়ে দিলাম হিশাম ইবনুল আস (রা:) এবং আয়াশ ইবনে আবি রাবিআহর (রা:) কাছে। হিশাম ইবনুল আস (রা:) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন এভাবে – ‘ওমরের (রা:) কাছ থেকে আমি এই চিঠিটি পেলাম যার মধ্যে শুধু দুটি আয়াত ছিল। আমি চিঠিটি পড়লাম এবং আল্লাহর কাছে এর মর্মার্থ বুঝার জন্য সাহায্য চাইলাম। আমি এবং আয়াশ (রা:) বুঝতে পেরেছিলাম আয়াত দুটি আমাদের জন্যই নাযিল হয়েছে। তাই আমি এবং আয়াশ দুজনেই আমাদের উটে চড়ে রাসূলের (ﷺ) কাছে ফিরে গেলাম।’

সুবহানাল্লাহ, এই সহিহ হাদিসটি থেকে বুঝা গেল আপনি যতই পথভ্রষ্ট হন না কেন, যতই আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা থেকে দূরে চলে যান না কেন, এই আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ আপনাকে ক্রমাগত ফিরিয়ে আনছেন। এমনকি শিরকের মতো সবচেয়ে খারাপ কাজও যদি আপনি করে থাকেন, আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালা বলছেন তাঁর রহমত থেকে নিরাশ না হতে এবং তার দিকে প্রত্যাবর্তন করতে। আয়াশ (রা:) এবং হিশামের (রা:) ক্ষেত্রেও আমরা একই ঘটনা দেখতে পাই।

আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদেরকে এমন মানুষ হিসেবে হিসেবে গড়ে তোলেন যারা তাঁর রহমত থেকে নিরাশ হয় না, যারা নিজেদের বিরুদ্ধে সীমালঙ্ঘন করে না, এবং যারা আল্লাহর কাছে ফিরে আসে অনুতপ্ত হৃদয়ে যখন তারা বুঝতে পারে যে তারা তাঁর থেকে দূরে চলে গেছে। আল্লাহুম্মা আমীন!
কখনো হতাশ হবে না

কুরআনের মানুষ
পর্ব : ২৪

মূল: ড. ওমর সুলাইমান

লিখেছেন

ফাহমিনা হাসানাত

ফাহমিনা হাসানাত

কিছুটা লেখালেখি করি, ইসলামিক লাইনে কিছুটা পড়াশোনা করি। তাজউইদ, গ্রামার এবং কুরআন মেমোরাইজেশন এর ক্লাস করছি আলহামদুলিল্লাহ।
নিজে শিখছি, অন্যকেও শিখাচ্ছি। লেখালেখিটাও ঠিক এরকম। নিজে জানার জন্য মনের আনন্দে লিখি, শেয়ার করি।

লেখকের অন্যান্য সকল পোষ্ট পেতে ঘুরে আসুন

কিছুটা লেখালেখি করি, ইসলামিক লাইনে কিছুটা পড়াশোনা করি। তাজউইদ, গ্রামার এবং কুরআন মেমোরাইজেশন এর ক্লাস করছি আলহামদুলিল্লাহ।
নিজে শিখছি, অন্যকেও শিখাচ্ছি। লেখালেখিটাও ঠিক এরকম। নিজে জানার জন্য মনের আনন্দে লিখি, শেয়ার করি।

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Islami Lecture