Writing

শয়তানের বিরুদ্ধে হাতিয়ার

সতর্কতা এবং স্মরণ: ইমাম ইবনুল জাওজি রহিমাহুল্লাহর উদাহরণ সহ একটি সুন্দর ব্যাখ্যা সংক্ষেপে তুলে ধরছি।
হৃদয় একটি দুর্গের মতো। ফেরেশতারা ঘন ঘন সেই দুর্গে আসা-যাওয়া করেন। দুর্গের ঠিক পাশের জায়গাটি প্রবৃত্তির, যেখানে শয়তানরা তাদের ইচ্ছামত আসে এবং যায়। দুর্গের দেয়াল শয়তানদের প্রবেশে বাধা দেয়, কিন্তু দেওয়ালের একটি দুর্বল স্থান খুঁজে বের করার জন্য শয়তানরা দেয়ালের বাইরে প্রদক্ষিণ করে।

আল্লাহর যিকির ও তাঁর প্রতি বিশ্বাসের দ্বারা দুর্গ আলোকিত হয়। এই দুর্গের দেওয়ালে স্বচ্ছ কাঁচ রয়েছে যার মধ্য দিয়ে এর প্রহরীরা যা কিছু যায় তা দেখতে পারে। শয়তান সর্বপ্রথম যে কাজটি করে তা হল ধোঁয়া দিয়ে দুর্গের দেয়াল কালো করে।’ [জিন ও শয়তানের বিশ্ব, আল আশকার]

আল্লাহর স্মরণ দ্বারা দুর্গের কাঁচ পরিষ্কার হয়, কিন্তু এই দুর্গকে ধোঁয়ায় কালো হতে দিলে অন্তরের প্রহরীরা বুঝতে পারে না কখন শয়তান প্রবেশ করে। তাই শয়তানের চক্রান্ত সম্পর্কে সর্বদা সজাগ থাকা এবং আল্লাহর স্মরণ ও তাঁর ক্ষমা প্রার্থনায় হৃদয়ের দুর্গকে আলোকিত রাখা আবশ্যক।

আল্লাহ তা’আলা বলেন-

নিশ্চয় যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে যখন তাদেরকে শয়তানের পক্ষ থেকে কোন কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তখনই তাদের দৃষ্টি খুলে যায়।
[সূরা আল-আরাফ:২০১]

আমরা যখনই আমাদের অন্তরে শয়তানের উপস্থিতি অনুভব করি, তখনই আমাদের উচিত আল্লাহকে স্মরণ করা এবং তাঁর কাছে ক্ষমা ও রহমত চাওয়া। এটি আমাদের হৃদয়ের কাঁচ পরিষ্কার করবে এবং আমাদের অন্তর্দৃষ্টি খুলে দিবে।

শরীয়তের প্রতি অটল থাকা:

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহ্ তা’আলা সীরাতে মুস্তাকিমের উদাহরণ দিয়েছেন (এরূপ) পথের দুই কিনারায় দুটো প্রাচীর। দুই প্রাচীরের মাঝে অনেকগুলো খোলা দরজা। দরজাগুলোতে পর্দা ঝুলানো। পথের মাথায় দাঁড়িয়ে একজন আহবায়ক ডাকছেন। পথের উপর থেকে ডাকছেন আরেকজন আহবায়ক।

আল্লাহ্ তা’আলা (মানুষকে) শান্তির আবাস (জান্নাত)-এর দিকে ডাকছেন এবং তিনি যাকে ইচ্ছা করেন তাকে সিরাতে মুস্তাকিমের দিকে হিদায়ত করেন। পথের দু’পাশের দরজাগুলো হল আল্লাহ্ নির্ধারিত সীমাসমূহ। কেউ আল্লাহর সীমা লংঘন করলে এতে পর্দা সরে যায়। উপর থেকে যিনি ডাকছেন তিনি হলেন পরওয়ারদিগারের পক্ষ থেকে উপদেশ দাতা।[তিরমিজি: ২৮৫৯]

শয়তানের প্রভু ও সৃষ্টিকর্তার কাছে আশ্রয় চাওয়া:

যদি আপনার বাড়ির কাছে একটি কুকুর থাকে এবং আপনি বাহিরে আসলেই যদি কুকুরটি আপনাকে কামড়ানোর চেষ্টা করে, আপনি দুটি উপায়ে এর মোকাবেলা করতে পারেন। হয় আপনি কুকুরের সাথে লড়াই করতে পারেন, এবং সম্ভবত আপনি আপনি হাসপাতালে ভর্তি হবেন এবং কুকুরের কামড়ের জন্য আপনাকে ইনজেকশন নিতে হবে, অথবা আপনি সরাসরি কুকুরের মালিকের কাছে যেয়ে কুকুরটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে বলতে পারেন।

যেহেতু আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল শয়তানকে এমন কিছু ক্ষমতা দিয়েছেন যা তিনি মানুষকে দেননি, তাই আমরা শয়তানকে ভয় পাই। আমরা মনে করি যে শয়তান আমাদের এমনভাবে ক্ষতি করতে পারে যে আমরা তাকে প্রতিরোধ করতে পারি না। আমরা যা ভুলে যাই তা হল, যিনি শয়তানকে সেই ক্ষমতা দিয়েছেন তিনি আমাদেরকে তাঁর কাছে আমাদের যা ইচ্ছা তা চাওয়ার আমন্ত্রণও জানিয়েছেন।

সম্মিলিতভাবে থাকা

ধার্মিক মুসলমানদের সাথে যোগাযোগ রাখা আমাদের জন্য জরুরী। নবীজি (সা.) বলেছেন,

…কারণ নেকড়ে একটি নির্জন ভেড়াকে খেয়ে ফেলে যা পাল থেকে দূরে থাকে। [আবু দাউদ]

তিনি আরো বলেন –

তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বসবাস কর। বিচ্ছিন্নতা হতে সাবধান থেকো। কেননা, শয়তান বিচ্ছিন্নজনের সাথে থাকে এবং সে দুজন হতে অনেক দূরে অবস্থান করে। যে লোক জান্নাতের মধ্যে সবচাইতে উত্তম জায়গার ইচ্ছা পোষণ করে সে যেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে থাকে (মুসলিম সমাজে)।
[তিরমিজি:২১৬৫]

শয়তানের বিপরীত পথে যাওয়া

এই নীতি রাসুলের (সা:) সুন্নতেও আমরা পাই। উদাহরণস্বরূপ, তিনি বলেন,

তোমাদের কেউ যখন খায় তখন সে যেন ডান হাতে খায় এবং যখন পান করে তখন সে যেন ডান হাতে পান করে, কারণ শয়তান বাম হাতে খায় এবং বাম হাতে পান করে। [আবু দাউদ]

এছাড়াও, দুপুরে ঘুমানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

‘দিনের বেলা অল্প সময়ের জন্য ঘুমাও কারণ শয়তান অল্প সময়ের জন্য ঘুমায় না।’ [আবু নুয়াইম]

সন্দেহজনক কিছু কিছু থেকে দূরে থাকা

মুমিনদের মা সাফিয়াহ রাসুল (সা:) মসজিদে ইতিকাফে থাকা অবস্থায় তাঁর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। যখন তিনি ফিরে আসছিলেন, তখন রাসুল (সা:) তাঁকে এগিয়ে দিতে এসেছিলেন। দু’জন আনসারী লোক পেছনে আসছিল, তারা নবীকে (সা:) দেখে তাদের চলার গতি বাড়িয়ে দিলেন। নবীজি (সা:) তাদেরকে বললেন, ‘তাড়াহুড়ো করো না। তিনি আমার স্ত্রী হুয়াইয়ের কন্যা সাফিয়াহ।’

তারা বললেন, ‘সুবহানআল্লাহ! হে আল্লাহর রাসূল! ‘

তিনি [তাঁদেরকে] বললেন, ’’নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের দেহে রক্ত চলাচলের ন্যায় চলাফেরা করে। তাই আমার আশংকা হল যে, সম্ভবত: সে তোমাদের অন্তরে মন্দ—অথবা তিনি বললেন—কোন কিছু [সন্দেহ] প্রক্ষেপ করতে পারে।’’
[বুখারী-মুসলিম, রিয়াদুস-সালেহীন: ১৮৪৯]

নবীর (সা.) জীবনের এই উদাহরণটি থেকে প্রতিমান হয় যে কেবল ধার্মিক হওয়াই নয়, দ্বীন সম্পর্কে অন্য লোকেরা আপনার সম্পর্কে যেন খারাপ ধারণা পোষণ না করে তা নিশ্চিত করা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। লোক দেখানোর জন্য নয়, এটি আপনার চারপাশের লোকদের থেকে শয়তানকে তাড়ানোর জন্য।

লোকেরা আপনাকে পানি ভর্তি একটি মদের বোতল বহন করতে দেখে ভাবতে পারে আপনি মদ পান করছেন। এতে শয়তান তাদের চিন্তাধারায় প্রবেশ করবে এবং আপনার প্রতি তাদের আচরণ পরিবর্তন করবে। তারা এটাও মনে করতে পারে যে মদ পান করা ‘অতটা খারাপ নয়’ কারণ আপনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং লম্বা দাড়ি রেখেও মদ পান করছেন। আপনি হয়তো বলতে পারেন, ‘তারা যা খুশি তাই ভাবুক, আমি জানি যে এই বোতলটিতে ঠাণ্ডা পানি আছে এবং অন্য কিছু নয়।’ সত্যিকার অর্থে আমরা কেবল আমাদের ক্রিয়াকলাপের জন্যই নয়, আমরা আমাদের চারপাশে যে প্রভাব তৈরি করি তার জন্যও দায়বদ্ধ।

লিখেছেন

ফাহমিনা হাসানাত

ফাহমিনা হাসানাত

কিছুটা লেখালেখি করি, ইসলামিক লাইনে কিছুটা পড়াশোনা করি। তাজউইদ, গ্রামার এবং কুরআন মেমোরাইজেশন এর ক্লাস করছি আলহামদুলিল্লাহ।
নিজে শিখছি, অন্যকেও শিখাচ্ছি। লেখালেখিটাও ঠিক এরকম। নিজে জানার জন্য মনের আনন্দে লিখি, শেয়ার করি।

লেখকের অন্যান্য সকল পোষ্ট পেতে ঘুরে আসুন

কিছুটা লেখালেখি করি, ইসলামিক লাইনে কিছুটা পড়াশোনা করি। তাজউইদ, গ্রামার এবং কুরআন মেমোরাইজেশন এর ক্লাস করছি আলহামদুলিল্লাহ।
নিজে শিখছি, অন্যকেও শিখাচ্ছি। লেখালেখিটাও ঠিক এরকম। নিজে জানার জন্য মনের আনন্দে লিখি, শেয়ার করি।

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Islami Lecture