হিদায়াত যেভাবে হারিয়ে যায়

এমন অনেক ভাই বোন আছেন আমাদের আশেপাশে যারা একটা সময় দ্বীনে ফিরেছিলেন। নামাজ, রোযা, জুব্বা, পাগড়ি, পর্দা, লিবাস, তাহাজ্জুদ, আমল, আখলাক, লেনদেন সব মিলিয়ে মিলিয়ে তারা যেনো ছিলেন একেকজন দ্বীনের পথে অনুপ্রেরণার বাতিঘর। তাদেরকে দেখে, তাদের দাওয়ায় মুগ্ধ হয়ে অনেকেই দ্বীনে ফিরেছে, আল্লাহ কে চিনেছে, জীবনকে আখিরাতমুখী করেছে।

কিন্তু, অত্যন্ত দুঃখের ব্যাপার হলো, সময়ের পরিক্রমায় তারা নিজেরাই আজ হারিয়ে গেছে। তাদের সেই অশ্রুভেজা দীর্ঘ নামাজ নেই, নেই আইয়ামে বীজের সিয়ামের খবর, তাহাজ্জুদ তো দূর কী বাত, ফরজ নামাজেও খুব একটা আজকাল দেখা যায় না।

হয়তোবা অফিসে বা বাসায় একাকি আদায় করেন, কথাবার্তায় সেই নূর নেই, নেই সেই আখিরাতের ফিকির, উম্মতের প্রতি, আশেপাশের প্রতিটা মানুষের আখিরাতের চিন্তায় বিভোর হয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগার সেই দিনগুলো, নেই দাওয়াহ এর সেই স্পৃহা, আর না আছে আল্লাহর ভালোবাসা, তার দ্বীন নিয়ে তেমন কোন আলোচনা৷

কারো কারো বাহ্যিক লেবাস টাও থাকেনা, হুট করে দেখা যায় দাড়িগুলো ছোট হয়ে গেছে, জুব্বা পাঞ্জাবী এখন শার্ট প্যান্টে প্রতিস্থাপিত হয়েছে, ব্যাংক জব বা এমন কোন জবে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে যেখানে হালাল হারামের মিশ্রণ, নন মাহরামের সাথে রেগুলার যোগাযোগ করতে হয়, নামাজ জামাতে পড়ার ব্যাপারটাও সেক্রিফাইস করতে হয় দুনিয়ার সার্ভাইভালের সার্থে!

অন্যদিকে, বোনদের ক্ষেত্রেও অনেকের নেই সেই পর্দা, হারিয়ে গেছে নন মাহরাম এড়িয়ে চলার কঠোর মনোভাব, নামাজ হয়ে গেছে শত ব্যস্ততার মাঝে বোঝাস্বরুপ, কখনো পড়া হয়, কখনো খেয়াল ই থাকেনা, ফেসবুকের প্রোফাইলে যেখানে দ্বীনি পোস্ট, কোটেশন শোভা পেতো, সেখানে হরেক সেলিব্রেটির ফানি পোস্ট, আর নিজের বেপর্দা ছবি, বিভিন্ন গেট টুগেদারের হাস্যজ্বল গ্রুপফিতে আপন উপস্থিতি সহ এমন বেদনাদায়ক পরিবর্তন এর কত শত বাস্তবতা!

খুব ই কষ্টের, দুঃখের এই ব্যাপারগুলো কেনো ঘটে? আসলে কী সেই কারণ বা কারণগুলো, যা কিনা হিদায়াতের আলো পাওয়া মানুষগুলোকে বদলে দেয় সময়ের পরিক্রমায়?

আল্লাহর ভাষায়, হে মানুষ কি সেই জিনিস যা তোমাকে তোমার রব্বের ব্যাপারে গাফেল করে রেখেছে?! এই মানুষগুলোতো একসময় এমন ছিলনা, তারা তো গাফেল ছিল না, তাহলে আজ তাদের কেনো এই করুণ দশা?

ব্যাপারটা ভালোভাবে জানা বোঝা প্রয়োজন। অন্তত আমাদের যাদের মাঝে ন্যুনতম ঈমানের আলো রয়েছে৷ হিদায়াত কে মৃত্যু পর্যন্ত ধরে রাখার দৃঢ় সংকল্প রয়েছে অন্তত তাদের জন্য এটা খুব ই গুরুত্বপূর্ণ।

হিদায়াত হলো নূর, উজ্জ্বল আলোর মত, কঠিন অন্ধকারের মাঝে পথ হারিয়ে ফেলা পথিকের কাছে উজ্জ্বল আলোকরশ্মি যেমন, জীবনের এই কঠিন পরীক্ষায় হিদায়াত হচ্ছে সেই আশার আলো।
জীবনকে সঠিক দৃষ্টি দিয়ে চেনার, জানার আলো। হাজারো শয়তানী বিচ্যুতির অন্ধকারের মাঝে সিরাতল মুস্তাকিমে সরল পথে চলার একমাত্র অবলম্বন।

রব্বের দেয়া অন্যসব নিয়ামতের মত হিদায়াতও এক প্রকার নিয়ামত। বলতে গেলে সবচেয়ে মূল্যবান নিয়ামত, কারণ ঈমানের চেয়ে বড় কোন সম্পদ আর হতে পারেনা।

নিয়ামতের কদর করলে, তা আল্লাহ বাড়িয়ে দেন, কিন্তু তার কদর না করলে, সঠিক রুপে যত্ন না নিলে তা ঠিক ই এক সময় হারিয়ে যায়৷ তেমনি হিদায়াতের ক্ষেত্রেও তা একই।

হিদায়াতের দুটো দিক আছে,

i) এক হলো আক্বলের হিদায়াত, আর
ii) অন্যটা হচ্ছে অন্তরের ইসলাহ।

আক্বলের বা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে হিদায়াত হচ্ছে আল্লাহ কে এবং আল্লাহর দ্বীন কে সকল ভুল ত্রুটির উর্ধে বিশ্বাস করা। নিজের বিবেক বুদ্ধি, জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা কে স্বীকার করে নিয়ে আল্লাহকে রব হিসেবে পারফেক্ট এবং তার দ্বীন কে সকল সন্দেহ থেকে মুক্ত হয়ে জীবনের একমাত্র চলার পথ বিশ্বাস করার যে মনোভাব তা আকলের হিদায়াত থেকে আসে।

আমরা যারা জেনারাল লাইন থেকে বা বিভিন্ন সংশয় থেকে পড়াশোনার মাধ্যমে দ্বীনে এসেছি তাদের অনেকের মাঝে আলহামদুলিল্লাহ আকলের হিদায়াত এর ব্যাপারটা রয়েছে। মানে যারা নাস্তিক, কাফির, সংশয়বাদীদের কোন প্রশ্নে, ভুল ব্যাখ্যায় ঈমানের ক্ষেত্রে আশংকায় ভোগেন না।
তারা আল্লাহর রহমতে আল্লাহকে এমন ভাবে জেনেছেন এবং তার দ্বীনকে এমনভাবে বুঝেছেন যে, কোন প্রশ্ন, ব্যাখ্যা, সংশয় ই তাদের বিশ্বাসে ফাটল ধরাতে পারেনা।

অন্যদিকে হিদায়াতের অন্য দিক অন্তরের ইসলাহ হচ্ছে এমন এক নিয়ামত যেখানে একটা মানুষ ইমোশনালি আল্লাহর সাথে কানেক্টেড ফিল করে, তার আমল, আখলাকে পরিবর্তন আনে, সে আমলের দিকে বেশি সচেতন, তাদের আমলে খুলুসিয়াত দেখা যায় অন্যদের চেয়ে বেশি।
নামাজ, রোযা, তাহাজ্জুদ থেকে শুরু করে নফল দোয়া দুরুদ আমলে তাদের জিন্দেগি, দ্বীনের পথে মানুষকে ডাকার ব্যাপারে যেনো তারা সবার অগ্রগামী। গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রেও তারা সবচেয়ে বেশি এগিয়ে। সোহবতের নূর তাদের জীবনে যেনো আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসে।

কিন্তু সমস্যা হলো, খুব অল্প সংখ্যক ভাইবোনেরাই আছেন যাদের মাঝে আক্বলের হিদায়াত, অন্তরের ইসলাহ এই দুই দিক থেকেই হিদায়াত রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনেকেই বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে ইসলাম কে সত্য এবং আল্লাহকে পারফেক্ট রব্ব হিসেবে উপলব্ধি করে থাকেন, তবে কোন আল্লাহ ওয়ালার সোহবতে নিজেকে নিজের ভেতরের সত্বার ইসলাহে যথেষ্ট গুরুত্ব দেন না।

বা ততটা সময় দেয়া হয়ে উঠেনা, ফলে শয়তান ইন দ্যা লং রান, তাদেরকে ধীরে ধীরে ভেতরের পুরোনো সব পাপের রোগে আক্রান্ত করে আবারো দ্বীনহারা বা লেবাসি প্র‍্যাক্টিসিং বানিয়ে ফেলে যাদের অন্তরে দ্বীনের সেই জজবা বা গুরুত্ব আর থাকেনা, তারা হয়ে যায় নামের দ্বীনি ভাই বা বোন, দ্বীন তাদের আকলে সত্য হিসেবে থাকলেও জীবনের আচরণে আমলে আর থাকেনা!
আফসোস!

অন্যদিকে এমন কিছু ভাইবোন আছেন, যারা বিভিন্ন দাওয়াতি দলের সাথে যুক্ত হয়ে, কারো বয়ান শুনে, কোন পীর বুজুর্গের সোহবতে থাকায়, বা দ্বীনি প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করার কারণে আমল আখলাকে যথেষ্ট এগিয়ে থাকেন, কিন্তু দ্বীনকে ইন্টেলেকচুয়ালি যে উপলব্ধি করতে হবে সেটা আর তাদের হয়ে উঠেনা।

যুগের প্রচলিত সংশয় বা ইসলামের এমন কোন বিধান যা এই যুগে আমলে সচরাচর দেখা যায়না, সেইসব বিধানের ব্যাপারে কেউ একটু কুযুক্তি বা বানোয়াট ইতিহাসের কথার ভেলকিবাজি দিয়ে তাদের অন্তরে দ্বীন সম্পর্কে সংশয় তৈরি করে ফেলতে পারে।

বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে তাদের দ্বীনের সত্যতার ব্যাপারে, রব্বের দেয়া বিধানের পারফেকশনের ব্যাপারে পূর্ণ ধারণা না থাকায়, যে কোন সময় তারা নাস্তিক, কাফিরদের চালে আটকে গিয়ে বা ভ্রান্ত মতাদর্শের কবলে পড়ে দ্বীন থেকে একটা সময় ছিটকে পড়েন!

তাই পরিপূর্ণ হিদায়াতের জন্য ইন্টালেকচুয়ালি দ্বীনকে বোঝা, আল্লাহকে ভালোভাবে চেনা যেমন অক্সিজেন এর মত জরুরি তেমনি নিজের নফসের ইসলাহের মাধ্যমে পুরোনো সব বাজে অভ্যাস, গুনাহের রোগের চিকিৎসাও জরুরি।

প্রথমটার জন্য প্রয়োজন বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনা,
দ্বিতীয়টার জন্য প্রয়োজন প্রকৃত খাঁটি আল্লাহ ওয়ালা লোকের সোহবতে নিজেকে শুধরানো। যে কোন এক দিকে দুর্বল হলেই বা হিদায়াতের অভাব থাকলেই শয়তান সেই দিক দিয়ে ঢুকে পুরো ঈমান ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে হিদায়াত কেড়ে নিয়ে যাবে!

এই জন্যই হিদায়াত পাওয়া যেমন কঠিন, তা আজীবন ধরে রাখা তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি কঠিন। যারাই চান আজীবন ঈমান আমল নিয়ে বেঁচে থেকে ঈমান নিয়ে, হিদায়াতের উপলব্ধি অন্তরে নিয়ে মরতে তাদের উচিত দুই দিকেই হিদায়াত ধরে রাখার ব্যাপারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া এবং মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে বেশি বেশি দু’আ করা।

হেদায়াতের পর অন্তরের বক্রতা হতে মুক্তি চাওয়াঃ

رَبَّنَا لاَ تُزِغْ قُلُوْبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَّدُنْكَ رَحْمَةً إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ
উচ্চারণঃ রব্বানা-লা-তুযিগ্ কুলূবানা- বা’দা ইয্ হাদাইতানা-অহাবলানা-মিল্ লাদুন্কা রহ্-মাতান্ , ইন্নাকা আন্তাল্ অহ্হা-ব্
অর্থঃ হে আমাদের রব, আপনি হিদায়াত দেয়ার পর আমাদের অন্তরসমূহ বক্র করবেন না এবং আপনার পক্ষ থেকে আমাদেরকে রহমত দান করুন।
[সূরা আলে ইমরান, ৩:৮]

দ্বীনের উপর অটল থাকার দু‘আ:

اللَّهُمَّ يَا مُقَلِّبَ الْقُلُوبِ ثَبِّتْ قَلْبِيْ عَلَى دِيْنِكَ
(আল্লাহুম্মা ইয়া! মুক্বাল্লিবাল ক্বুলুব, ছাব্বিত ক্বলবী আ’লা দ্বীনিক)
অর্থ:- হে আল্লাহ ! হে হৃদয়ের পরিবর্তন কারী ! আপনি আমার হৃদয়-কে আপনার দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন।
[১/তিরমিযী ২১৪০, ২/ইবনে মাজাহ ৩৮৩৪, ৩/মিশকাত ১০২]

দ্বীনের উপর অবিচল থাকার দু‘আঃ

يَا مُصَرِّفَ الْقُلُوْبِ ثَبِّتْ قَلْبِيْ عَلٰى طَاعَتِكَ
উচ্চারণঃ ইয়া মুসাররিফাল ক্বুলূব সাব্বিত ক্বলবী ‘আলাা ত্বা‘আতিক।
অর্থ: হে হৃদয়সমূহের আবর্তনকারী! আমার হৃদয়কে তোমার আনুগত্যের উপর মজবুত রাখ।
(নাসায়ী সুনানে কুবরা, হাদীস: ১০১৩৭)

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে দ্বীনের উপর অটল থাকার তৌফিক দিন। (আমীন)

Exit mobile version