কুরআনে ভালোবাসাকে কিভাবে অন্বেষণ করা হয়েছে

আমাদের সবার মাঝেই বন্ধন রয়েছে, সাম্প্রদায়ের পরস্পরের মধ্যে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে, মা এবং সন্তানের মধ্যে। এর মধ্যে কিছু কিছু বন্ধন প্রাকৃতিক যেমন মায়ের সাথে সন্তানের বন্ধন। আবার কিছু বন্ধন সৃষ্টি হয় পথ চলতে চলতে মানুষের সাথে পরিচয়ের কারণে। বস্তুত এটি একটি অনুভূতি, আর এই অনুভূতি থেকেই ভালোবাসার জন্ম। আপনি হয়তো ভাবছেন কুরআনে ভালোবাসার উল্লেখ আছে কিনা?
উত্তরটি হল হ্যাঁ, অবশ্যই আছে।

আল্লাহ তাঁর কিতাবে তাঁর বাণীর মাধ্যমে আমাদের শিখিয়েছেন যে ভালবাসা বিভিন্ন স্তরের হতে পারে – আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার প্রতি ভালোবাসা, রাসুলের (স:) প্রতি ভালোবাসা, এবং অবশ্যই মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা।

প্রথমটি সম্পর্কে কথা বলা যাক, আমি কি আসলেই আল্লাহকে ভালোবাসি?
আমাদের প্রত্যেকেরই নিজেদেরকে এই প্রশ্নটি করা উচিত। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন, এটা কেবল নিছক দাবি নয়। আল্লাহ তাআলা কুরআনে উল্লেখ করেছেন আল্লাহকে ভালোবাসার কিছু নিদর্শন আছে। আমাদের কর্মের মাধ্যমে, এটা কি বিশেষ কোন আমল?
আল্লাহ তায়ালা সূরা আলি’ ইমরানে বলেছেন, এবং তিনি বলেছেন রাসূলুল্লাহর (সা.) মাধ্যমে –

قُلۡ إِن كُنتُمۡ تُحِبُّونَ ٱللَّهَ فَٱتَّبِعُونِى يُحۡبِبۡكُمُ ٱللَّهُ وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡ ذُنُوبَكُمۡۗ وَٱللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
বল, ‘যদি তোমরা আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’।
[সূরা আল ইমরান:৩১]

এটি একটি অত্যন্ত স্পষ্ট আয়াত। এটা এমন কোন আয়াত নয় যার একের অধিক অর্থ হতে পারে। রাসূলুল্লাহকে (সা:) বলা হচ্ছে, বল, তোমরা কি সত্যিই আল্লাহকে ভালোবাসো?
তাহলে তা তোমরা তোমাদের কর্মের মাধ্যমে দেখাও, আমাকে অনুসরণের মাধ্যমে তা দেখাও। সুন্নতের প্রতি আমাদের মনোভাব আসলে কেমন? আমরা কি সুন্নতকে কেবল সুন্নত হিসেবেই দেখি, কোনরকমে ফরজ নামাজ পড়েই উঠে যাই? আমাদের মনোভাব কি এমন যে সুন্নত না পড়লেও চলবে, কারণ এটা তো ফরজ নয়?

আমাদের প্রতিটি কাজে এবং কর্মে রাসুলকে (সা:) অনুসরণ করতে হবে কোন যুক্তি ছাড়াই। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে -“action speaks louder than words”. রাসুলকে (সা:) অনুসরণের মাধ্যমে আমি কেবল আল্লাহর কাছে প্রমাণ করতে চাইছি না যে আমি আমার অনুভূতিতে সত্য, বরং আমি আল্লাহকে জানাতে চাই যে আমি তাঁর ভালোবাসার কাঙ্গাল। আমি আল্লাহর ভালোবাসা চাই, আর আল্লাহ যখন আমাকে ভালোবাসবেন তখন আমার আর কি চাইবার আছে?

আপনি যে আল্লাহকে ভালবাসেন তার একটি নিদর্শন হল আপনি তাঁর আনুগত্য করেন। এ প্রসঙ্গে একজন মহিলা কবির একটি বিখ্যাত কবিতার উল্লেখ করছি।

আল্লাহর অবাধ্য হয়েও
কি করে দাবি করো,
তুমি করো তাঁকে মান্য?
বুঝতে পারি না আমি
তোমার এই অসম্ভব দাবি।
প্রতিপালকের প্রতি যদি
ভালোবাসা হয় সত্য,
বান্দা কখনো হয় না অবাধ্য।
যে জন তাঁর প্রেমে সিক্ত
প্রিয়তমকে ভালোবেসে
সেই হয় তাঁর অনুগত।

এছাড়া আল্লাহ বলেছেন তিনি কাদের ভালবাসেন, তিনি ভালোবাসেন মুহসিনিনদের – যারা শ্রেষ্ঠত্বের সাথে কাজ করে, মুত্তাকিদের – যারা আল্লাহ সচেতন। পক্ষান্তরে যারা অন্যায় করে, যারা তাঁকে বিশ্বাস করে না, এবং যারা অকৃতজ্ঞ আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন না।

কাজেই কুরআনে উল্লেখিত প্রথম ভালোবাসা হলো স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা, দ্বিতীয়ত, রাসূলুল্লাহর (সা:) প্রতি ভালোবাসা। আমি যে আমার রাসুলকে (সা:) ভালবাসি তার নিদর্শন হলো আমি তাকেই আমার জীবনে পথিকৃৎ হিসেবে নেই। প্রকৃতপক্ষে রাসুলের (সা:) দৃষ্টান্তই সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত।

لَّقَدۡ كَانَ لَكُمۡ فِى رَسُولِ ٱللَّهِ أُسۡوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرۡجُواْ ٱللَّهَ وَٱلۡيَوۡمَ ٱلۡأٓخِرَ وَذَكَرَ ٱللَّهَ كَثِيرًا
অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে।
[সূরা আহযাব:২১]

তাহলে, মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা?
হ্যাঁ অবশ্যই তা আছে, এ প্রসঙ্গে নবী ইয়াকুবের (আ:) তার পুত্র ইউসুফের (আ:) প্রতি কিংবদন্তি ভালোবাসার কথা উল্লেখ করা যায়। তিনি তার পুত্র ইউসুফকে (আ:) এতটাই ভালবেসেছিলেন যে তার অন্যান্য ছেলেরা বলেছিল –

إِذۡ قَالُواْ لَيُوسُفُ وَأَخُوهُ أَحَبُّ إِلَىٰٓ أَبِينَا مِنَّا وَنَحۡنُ عُصۡبَةٌ
যখন তারা বলেছিল, ‘নিশ্চয় ইউসুফ ও তার ভাই আমাদের পিতার নিকট আমাদের চেয়ে অধিক প্রিয়, অথচ আমরা একই দল।....
[সূরা ইউসুফ:৮]

ইউসুফের (আ:) নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় তিনি এতটাই ব্যথিত হয়েছিলেন যে তিনি কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। এই ভালোবাসা হল পুত্রের প্রতি একজন পিতার ভালোবাসা।

এরপর আসছে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয় স্বজনের প্রতি ভালোবাসা। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সূরা বাকারায় বলেছেন –

مِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ ٱللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمۡ كَحُبِّ ٱللَّهِۖ
আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, তাদেরকে আল্লাহকে ভালবাসার মত ভালবাসে।...
[সূরা বাকারা:১৬৫]

সুবহানাল্লাহ! তিনি আমাদের সৃষ্টি কর্তা, তিনি আমাদের খুব ভালো করেই জানেন। মানুষের মধ্যে দুটি দল আছে। একদল কিছু মানুষকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করে, এবং তাদেরকে আল্লাহর চেয়ে বেশি ভালোবাসে। যখন আল্লাহ কোন কিছু আদেশ করেন বা নিষেধ করেন, তাদের ভালোবাসার মানুষগুলো উল্টোটা বলে। তখন তারা আল্লাহর আনুগত্য না করে ওই মানুষগুলোকে অনুসরণ করে। আরো একটি দল রয়েছে যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন-

وَٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓاْ أَشَدُّ حُبًّا لِّلَّهِۗ
আর যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহর জন্য ভালবাসায় দৃঢ়তর।
[সূরা বাকারা:১৬৫]

প্রকৃত মু’মিনদের নিদর্শন হলো, আল্লাহর প্রতি তাদের ভালোবাসা সবকিছুর উর্ধ্বে। এটা আমাদের সকলের জীবনে একটি দৈনন্দিন সংগ্রাম। যখন আমাকে এমন কিছুর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হয় যা আমি ভালোবাসি, কিন্তু আল্লাহ ভালোবাসেন না, তারপরও যদি আমি তা করি তবে আমাকে ভেবে দেখতে হবে আল্লাহকে আমি কতটুকু ভালবাসি। এর বিপরীতে, আমি যদি এমন কিছু করি যা আমি করতে চাই না বা পছন্দ করি না, কিন্তু কেবলমাত্র আল্লাহ তায়ালা ভালোবাসেন বলে আমি কাজটি করছি, সেটাই হবে আমার আনুগত্য। এটাই প্রমাণ করে যে আল্লাহর প্রতি আমার ভালবাসা সব কিছুর ঊর্ধ্বে।

আল্লাহ যেন এই পৃথিবীতে তাঁর সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে ভালোবাসা ছড়িয়ে দেন, এবং সর্বোপরি তাঁর প্রতি সবার ভালোবাসা যেন থাকে সব কিছুর উর্ধ্বে। আমিন ইয়া রব্বিল আলামিন।

সিরিজ: কুরআনে সব আছে

মূল: ড: হাইফা ইউনিস

লিখেছেন

ফাহমিনা হাসানাত

কিছুটা লেখালেখি করি, ইসলামিক লাইনে কিছুটা পড়াশোনা করি। তাজউইদ, গ্রামার এবং কুরআন মেমোরাইজেশন এর ক্লাস করছি আলহামদুলিল্লাহ।
নিজে শিখছি, অন্যকেও শিখাচ্ছি। লেখালেখিটাও ঠিক এরকম। নিজে জানার জন্য মনের আনন্দে লিখি, শেয়ার করি।

লেখকের অন্যান্য সকল পোষ্ট পেতে ঘুরে আসুন

কিছুটা লেখালেখি করি, ইসলামিক লাইনে কিছুটা পড়াশোনা করি। তাজউইদ, গ্রামার এবং কুরআন মেমোরাইজেশন এর ক্লাস করছি আলহামদুলিল্লাহ।
নিজে শিখছি, অন্যকেও শিখাচ্ছি। লেখালেখিটাও ঠিক এরকম। নিজে জানার জন্য মনের আনন্দে লিখি, শেয়ার করি।

Exit mobile version