যাকাতের টুকিটাকি – পর্ব ০২

যাকাতের টুকিটাকি – পর্ব ০২

বাসার মেয়েদের স্বর্ণ একত্র করলে নেসাব পূর্ণ হয়,একত্র না করলে হয় না-এক্ষেত্রে করণীয় কী?
অর্থাৎ যদি বাসার মা,মেয়ে এদের প্রত্যেকের স্বর্ণ যদি পৃথকভাবে সাড়ে সাত ভরি না হয় যেমন মায়ের আছে ৩ ভরি,এক মেয়ের আছে ২ ভরি এবং অন্য মেয়ের ২.৫ ভরি অর্থাৎ সবারটা মিলিয়ে ৭.৫ ভরি হয় তবে যাকাত দিতে হবে কি না,দিতে হলে কিভাবে- এর উত্তর হচ্ছে যাকাত দিতে হবে না।

এক্ষেত্রে বিধান হবে ব্যাক্তিকেন্দ্রিক, উদাহরণ স্বরূপ উপরের ঘটনায় যদি মার একাই ৭.৫ ভরির মতো স্বর্ণ থাকতো তবে তার উপর যাকাত ফরজ হতো কিন্তু দুই মেয়ের নেসাব পরিমাণ স্বর্ণ না থাকায় তাদের যাকাত আদায় করতে হবেনা।

ঋণগ্রস্থ ব্যক্তির যাকাতের বিধান কি?

সাধারণ ঋণ যদি হয় অর্থাৎ খেয়ে পরে বাঁচার জন্য ঋণ নেওয়া হয় তবে,
এরূপ ব্যক্তির কর্তব্য হচ্ছে যাকাতের জন্য উপযুক্ত ছয়টি খাতে সম্পদ আছে কিনা তা দেখা এবং সেগুলো একত্রিত করে মূল্যমান বের করা।এক‌ইসাথে তার ঋণের পরিমাণ ও হিসাব করতে হবে। এরপর মোট সম্পদের মূল্য এবং মোট ঋণের পার্থক্য বের করতে হবে।
যদি এই পার্থক্য পরিমাণ অর্থ সম্পদ নেসাব পরিমাণ সম্পদ এর সমান হয় তবে যাকাত দিতে হবে।
কিন্তু যদি শিল্প ঋণ,ব্যবসায়িক ঋণ, উন্নয়নমূলক ঋণ হয় তবে,
আপনি সম্পদ ও ঋণের পার্থক্য বের করবেন না বরং আপনার যে মোট সম্পদ আছে ঋণব্যাতীত তার জন্য যাকাত দিতে হবে যদি নেসাব পরিমাণ হয়।

মসজিদ-মাদরাসায় যাকাতের টাকা দেওয়া যাবে কিনা?

মসজিদ কিংবা মাদ্রাসার উন্নয়নমূলক কাজে কিংবা মাদ্রাসায় শিক্ষকদের বেতন দিতে এসব ক্ষেত্রে যাকাত দেওয়া যাবে না। কেননা এতে যাকাতের টাকা ধনী গরীব সবার জন্য ব্যয় হ‌য় কিন্তু আপনার টার্গেট গরীব,অভাবী মানুষ যাদেরকে সামর্থ্যবান করার জন্য যাকাত দিবেন।
তবে ইচ্ছে করলে, মাদ্রাসার লিল্লাহ ফান্ডে যাকাতের টাকা দিতে পারেন যেখানকার অর্থ কেবলমাত্র গরীব অভাবী ছাত্রদের জন্য ব্যায় করা হয়।

শাড়ি লুঙ্গি দিয়ে যাকাত আদায় করা যাবে কিনা?

আমাদের সমাজের প্রচলিত একটি রীতি কিন্তু এভাবে যাকাত আদায়ের বিষয়টি গর্হিত,এভাবে যাকাত আদায় করা যাবে না।যাকাতে আমাদের উদ্দেশ্য‌ই থাকে অভাবী কে সাহায্য করা, এক্ষেত্রে একজন মানুষের শাড়ি লুঙ্গির থেকে আরো প্রয়োজনীয় জিনিস থাকতেই পারে যেমন তার ঘরে খাবার নেই, ওষুধের টাকা নেই সেখানে আপনি একটা শাড়ি কিংবা লুঙ্গি দিয়ে যাকাত আদায় করে ফেলতে চান!
এক্ষেত্রে আপনি অন্ততপক্ষে ঐ অভাবী লোকটির খবর নিন,তাকে টাকা দিন কিন্তু তথাকথিত যাকাতের শাড়ি লুঙ্গির নামে যাকাতের প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে বঞ্চিত করবেন না।

যাকাতের টাকা দিয়ে নলকূপ খনন কিংবা জনকল্যাণমূলক কাজ করা যাবে কিনা?

উত্তর হচ্ছে না করা যাবে না, এক্ষেত্রে যাকাত আদায় করা হবে না।যাকাতের উদ্দেশ্য গরীবকে ধনী বানিয়ে দেওয়া কিন্তু আমার খননকৃত নলকূপ কোনো অভাবী মানুষের একচ্ছত্র সম্পদ হলো না উল্টো সমাজের সবাই ভোগ করলো সেক্ষেত্রে যাকাত আদায় হবে না।
তবে হ্যা আপনার কাছে অভাবী লোকটি বললো তার বাসায় একটা নলকূপ দরকার, আপনি তার দাবিমতো যাকাতের টাকা দিয়ে নলকূপ স্থাপন করিয়ে দিলেন তবে যাকাত আদায় হয়ে যাবে কিন্তু জনকল্যাণমূলক কাজ করলে যাকাত আদায় হবে না।

শিশুদের সম্পদের যাকাত দিতে হবে কিনা?

একদল উলামায়ে কেরাম মনে করেন শিশু যেহেতু নাবালক তাই তার সম্পদের উপর যাকাত ফরজ হবে না। অন্য একদলের মতে,যাকাত ব্যাক্তিকে দেখে না বরং সম্পদকে দেখে আর সম্পদ নেসাব পরিমাণ থাকলেই যাকাত দিতে হবে।
বিষয়টি নিয়ে ইজতেহাদি পার্থক্য বিদ্যমান এবং উভয় পক্ষেই ভালো যুক্তি বিদ্যমান আর তাই বিষয়টি এখনো গবেষণামূলক।

যাকাত কি রমাজান মাসে দিতে হয়?

যাকাত রামাদান মাসের বিশেষ কোনো ইবাদাত না বরং এটা নির্ভর করে আপনার অর্থসম্পদের বয়স এক বৎসর হলো কিনা তার উপর।বৎসর পূর্ণ হলেই যাকাত দেওয়া কর্তব্য।হ্যা এখন যদি আপনি গত রামাদান সম্পদের মালিক হয়েছেন আর এই রামাদানে আপনার সম্পদের এক বৎসর পূর্ণ হয়েছে সেই হিসাবে এই রামাদানে আপনাকে যাকাত আদায় করতে হবে।
এক্ষেত্রে অনেককে দেখা যায় রামাদান আসার মাস দুই বা তিনেক পূর্বে যাকাত ফরজ হয়ে যায় কিন্তু তারা রামাদান পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চান,এমনটা করবেন না,এমনটা করা অনুচিত। আপনি রামাদানে দান সাদকা করুন,যাকাত সময় মতো আদায় করে দিন।

যাকাত অগ্রিম দেওয়া যাবে কিনা?

হ্যা অগ্রিম দিতে পারবেন। যেমন আপনার আরো দুই মাস পর বছর পূর্ণ হবে কিন্তু আপনি এখন‌ই এমন ব্যক্তি পেয়েছেন যাকে যাকাতের অর্থ দেওয়া যায়,এরূপ ক্ষেত্রে আপনি ইচ্ছা করলে যাকাত দিতে পারবেন এবং দুই মাস পর যখন সময় হবে তখন হিসাব মিলিয়ে নিবেন।
যেমন-আপনি অগ্রীম ১০ হাজার টাকা যাকাত দিলেন এবং হিসাব করে দেখলেন ১২ হাজার টাকা যাকাত হয় তবে আপনি আর বাকি ২ হাজার টাকা দিয়ে দিলেই যাকাত আদায় হয়ে যাবে।আবার যদি এমন হয় হিসাবে দেখলেন ৮ হাজার টাকা আসলো তবে ২ হাজার টাকা অগ্রীম দেওয়া থাকলো, এতে কোনো সমস্যা নেই,পরের বছর হিসাবে মিলিয়ে নিবেন।

যাকাতের টাকা ধীরে ধীরে দেওয়া যাবে না?

আমাদের মধ্যে অনেকেই আছেন যারা বছর শেষে যাকাতের টাকা আলাদা করেন ঠিক‌ই কিন্তু সেই টাকা একটু একটু করে সারাবছর দিয়ে যান,এরূপ টা করতে পারবেন না।যাকাতের টাকা সময় হলেই দিয়ে দিতে হবে এবং তা গরীব মানুষের হাতে গেলেই তবে যাকাত আদায় হবে। এমনকি আপনি যদি চিন্তা করেন যে আমি যাকাতের টাকা আলাদা করে রাখলাম তাতেও আপনার যাকাত আদায় হবে না।

কয়েক বছরের যাকাত দেওয়া হয়নি,এখন কি করবো?

তাওবা করবেন, আল্লাহর কাছে মাফ চাইবেন এবং বিগত যেই বছরগুলোতে আপনার হাতে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা সত্ত্বেও যাকাত দেননি তা হিসাব করে একসাথে আদায় করে দিবেন।যদি পরিপূর্ণ হিসাব না করতে পারেন তবে কাছাকাছি একটা অনুমান করেও দিতে পারেন তবে আপনাকে যাকাত অবশ্যই আদায় করতে হবে।

|| যাকাতের টুকিটাকি ||
পর্ব ০২

উত্তর প্রদানে
শায়খ আহমাদুল্লাহ

শ্রুতিলিখন
মাহিনুর রহমান

Exit mobile version